বাংলা নববর্ষকে ঘিরে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আবারও শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘বউমেলা’। পহেলা বৈশাখে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর তিনদিনব্যাপী এ মেলার দ্বিতীয় দিনেই জমে ওঠে মূল আয়োজন। দূর-দূরান্ত থেকে আগত সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন জয়রামপুর এলাকার ঐতিহ্যবাহী বটবৃক্ষের বটতলায় অনুষ্ঠিত এই মেলা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। শতবর্ষী বটগাছকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই আয়োজন স্থানীয়দের কাছে ‘সিদ্ধেশ্বরী বটতলার বউমেলা’ নামে সুপরিচিত।
সকালের প্রথম প্রহর থেকেই বটতলার আশপাশ এলাকায় ভক্তদের ঢল নামে। নববধূ থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ নারীরা ফল-ফলাদি, মিষ্টান্ন ও পূজার সামগ্রী নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে বটবৃক্ষের নিচে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। রঙিন শাড়ি, ফুলেল সাজ আর ধর্মীয় আবহে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক বর্ণিল উৎসবে। কুমারী মেয়েদের অংশগ্রহণ মেলাকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই বটবৃক্ষ ‘সিদ্ধেশ্বরী দেবী’ হিসেবে পূজিত হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। প্রতি বছর নববর্ষে এখানে পূজা দিলে সংসারে সুখ-শান্তি আসে এবং স্বামী-সন্তানের মঙ্গল হয়। এ বিশ্বাস থেকেই নারীরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন এই দিনের জন্য। অনেকেই মানত পূরণের অংশ হিসেবে কবুতর উড়ানো এবং পাঁঠা বলি প্রদান করেন।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সমাহার। মৃৎশিল্পীদের তৈরি টেপা পুতুল, হাতি-ঘোড়া, পাখি, হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা সামগ্রী দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে। পাশাপাশি বাঁশ, কাঠ ও লৌহশিল্পের তৈরি ব্যবহার্য জিনিসপত্র, বাহারি মিষ্টান্ন এবং মন্ডা-মিঠাইয়ের দোকান মেলাকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের জন্যই রয়েছে আনন্দের আয়োজন।
মেলায় আগত নারীরা জানান, পারিবারিকভাবে বড়দের কাছ থেকে এই মেলার গুরুত্ব সম্পর্কে জেনে আসছেন তারা। প্রতি বছর এখানে এসে পূজা দিয়ে সংসারের কল্যাণ কামনা করেন। তাদের বিশ্বাস, এই পূজা জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে।
পুরোহিত উৎপল ভট্টাচার্য বলেন, বহু বছর ধরে এ মেলা ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দুপুরে আনুষ্ঠানিক পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে মূল কার্যক্রম শুরু হয় এবং দিনভর ভক্তদের আগমন অব্যাহত থাকে।
আয়োজক কমিটির কর্মকর্তা নিলোৎপল রায় জানান, প্রতি বছর নববর্ষ উপলক্ষে সিদ্ধেশ্বরী কালীপূজার আয়োজন করা হয়। এটি সম্পূর্ণ সার্বজনীনভাবে উদযাপিত হয় এবং এতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ অংশ নেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, মেলাকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নারী-কেন্দ্রিক এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির অনন্য সংমিশ্রণে সোনারগাঁয়ের এই বউমেলা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি গ্রামীণ জীবনের প্রাণের উৎসব, যা যুগের পর যুগ ধরে বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে আসছে।

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬
বাংলা নববর্ষকে ঘিরে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আবারও শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘বউমেলা’। পহেলা বৈশাখে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর তিনদিনব্যাপী এ মেলার দ্বিতীয় দিনেই জমে ওঠে মূল আয়োজন। দূর-দূরান্ত থেকে আগত সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন জয়রামপুর এলাকার ঐতিহ্যবাহী বটবৃক্ষের বটতলায় অনুষ্ঠিত এই মেলা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্রামীণ সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। শতবর্ষী বটগাছকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই আয়োজন স্থানীয়দের কাছে ‘সিদ্ধেশ্বরী বটতলার বউমেলা’ নামে সুপরিচিত।
সকালের প্রথম প্রহর থেকেই বটতলার আশপাশ এলাকায় ভক্তদের ঢল নামে। নববধূ থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ নারীরা ফল-ফলাদি, মিষ্টান্ন ও পূজার সামগ্রী নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে বটবৃক্ষের নিচে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। রঙিন শাড়ি, ফুলেল সাজ আর ধর্মীয় আবহে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক বর্ণিল উৎসবে। কুমারী মেয়েদের অংশগ্রহণ মেলাকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই বটবৃক্ষ ‘সিদ্ধেশ্বরী দেবী’ হিসেবে পূজিত হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। প্রতি বছর নববর্ষে এখানে পূজা দিলে সংসারে সুখ-শান্তি আসে এবং স্বামী-সন্তানের মঙ্গল হয়। এ বিশ্বাস থেকেই নারীরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন এই দিনের জন্য। অনেকেই মানত পূরণের অংশ হিসেবে কবুতর উড়ানো এবং পাঁঠা বলি প্রদান করেন।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সমাহার। মৃৎশিল্পীদের তৈরি টেপা পুতুল, হাতি-ঘোড়া, পাখি, হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা সামগ্রী দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে। পাশাপাশি বাঁশ, কাঠ ও লৌহশিল্পের তৈরি ব্যবহার্য জিনিসপত্র, বাহারি মিষ্টান্ন এবং মন্ডা-মিঠাইয়ের দোকান মেলাকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের জন্যই রয়েছে আনন্দের আয়োজন।
মেলায় আগত নারীরা জানান, পারিবারিকভাবে বড়দের কাছ থেকে এই মেলার গুরুত্ব সম্পর্কে জেনে আসছেন তারা। প্রতি বছর এখানে এসে পূজা দিয়ে সংসারের কল্যাণ কামনা করেন। তাদের বিশ্বাস, এই পূজা জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে।
পুরোহিত উৎপল ভট্টাচার্য বলেন, বহু বছর ধরে এ মেলা ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দুপুরে আনুষ্ঠানিক পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে মূল কার্যক্রম শুরু হয় এবং দিনভর ভক্তদের আগমন অব্যাহত থাকে।
আয়োজক কমিটির কর্মকর্তা নিলোৎপল রায় জানান, প্রতি বছর নববর্ষ উপলক্ষে সিদ্ধেশ্বরী কালীপূজার আয়োজন করা হয়। এটি সম্পূর্ণ সার্বজনীনভাবে উদযাপিত হয় এবং এতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ অংশ নেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, মেলাকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নারী-কেন্দ্রিক এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির অনন্য সংমিশ্রণে সোনারগাঁয়ের এই বউমেলা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি গ্রামীণ জীবনের প্রাণের উৎসব, যা যুগের পর যুগ ধরে বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে আসছে।

আপনার মতামত লিখুন