পুলিশের গুলিতে নিথর হওয়ার পর টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তরুণ হৃদয়কে; প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এল সেই ভয়াবহ ঘটনার প্রামাণ্য দৃশ্য।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বাংলাদেশ যখন এক নতুন দিগন্তের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল, তখন গাজীপুরের কোনাবাড়িতে ঘটে যাচ্ছিল এক লোমহর্ষক ট্র্যাজেডি। শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার খবরে যখন চারদিকে আনন্দের মিছিল, ঠিক তখনই কাশিমপুর রোডে পুলিশের গুলিতে ঝরে যায় এক তরুণের স্বপ্ন। মো. হৃদয় নামের সেই তরুণকে গুলি করার পর লাশটি ঠিক কোথায় গুম করা হয়েছিল, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই উত্তর আজও অজানাই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট’ (আইটিজেপি)-এর এক প্রামাণ্যচিত্রে সেই বিকেলের ভয়াবহ দৃশ্যগুলো ফুটে উঠেছে।ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকেলে দাঙ্গা পুলিশের পোশাক পরা কয়েকজন সদস্য হৃদয়কে ঘিরে ধরে শরীফ জেনারেল হাসপাতালের সামনে নিয়ে যান। সেখানে এক পুলিশ সদস্য খুব কাছ থেকে হৃদয়ের পিঠে শটগান ঠেকিয়ে গুলি করেন। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ২১ বছর বয়সী এই তরুণ। প্রত্যক্ষদর্শীরা শিউরে ওঠেন যখন দেখেন, নিথরপ্রায় দেহটিকে পুলিশ সদস্যরা চ্যাংদোলা করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন কোনাবাড়ি থানার একটি গলির দিকে। সড়কে দীর্ঘ রক্তের রেখা যেন সেই নৃশংসতার সাক্ষ্য দিচ্ছিল। সেই গলি থেকে হৃদয়কে আর জীবন্ত বা মৃত অবস্থায় ফিরিয়ে পায়নি তাঁর পরিবার।টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার আলমনগর গ্রামের লাল মিয়া ও রেহেনা বেগমের একমাত্র ছেলে ছিলেন হৃদয়। অভাবের সংসারে হাল ধরতে অটোরিকশা চালানোর পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। আজ তাঁর সেই অটোরিকশাটি আছে, কিন্তু নেই হৃদয়ের পদচারণা। তাঁর বাবা লাল মিয়ার আকুতি এখন একটাই, “পুলাটারে কবর দিমু, ওর হাড্ডি পাইলেও চলব।” একটি বাবার এমন আর্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকের চোখেই জল এনেছে।হৃদয়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ২০২৪ সালের অক্টোবরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করে তাঁর পরিবার। তদন্তের এক পর্যায়ে কনস্টেবল আকরাম হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হলে জানা যায়, হৃদয়ের মরদেহটি তুরাগ নদে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ডুবুরি দল নিয়ে তুরাগ নদে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হলেও কোনো দেহাবশেষ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সরকারি তালিকায় আজও শহীদের স্বীকৃতি মেলেনি এই তরুণের, মেলেনি কোনো আর্থিক সহায়তাও।হৃদয়ের বোন জেসমিন আক্তার ক্ষোভ আর আক্ষেপ নিয়ে বলেন, বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো গতি নেই। যারা তাঁর ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ গুম করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির অপেক্ষায় দিন গুনছে তাঁর পরিবার। ৫ আগস্টের বিপ্লবে অনেকের আত্মত্যাগে বিজয় এলেও হৃদয়ের পরিবারের কাছে তা আজও এক অমীমাংসিত শোকের গল্প। পরিবারটির এখন শেষ ইচ্ছা, হৃদয়ের অন্তত দেহাবশেষটুকু পাওয়া গেলে তাঁকে নিজ গ্রামে সম্মানের সাথে সমাহিত করা যেত।পরি-কন্ঠ/মুয়াজ