নারী পাচারের মামলা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকলেও প্রভাবশালী মহলের তদবিরে ২৫ এজেন্সির তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে অখ্যাত সব প্রতিষ্ঠান।মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটলেও নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ‘সিন্ডিকেট’ বিতর্ক। দেশটিতে কর্মী পাঠানোর জন্য সম্প্রতি যে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাই করা হয়েছে, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই মালয়েশিয়া সরকারের নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত এবং অভিজ্ঞতাহীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করায় জনশক্তি রপ্তানি খাতে চরম অস্থিরতা ও অস্বচ্ছতার চিত্র ফুটে উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, মালয়েশিয়া সরকার রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মোট ১০টি কঠোর শর্ত দিয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল কোনো এজেন্সির বিরুদ্ধে মানব পাচার বা অন্য কোনো অপরাধের আইনি রেকর্ড থাকা যাবে না। অথচ বর্তমানে নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির মধ্যে অন্তত চারটির বিরুদ্ধে বিদেশে নারী পাচারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই তালিকায় থাকা রিফা ইন্টারন্যাশনাল, জেনারেল ট্রেডিং, গডনেস সার্ভিস লিমিটেড ও ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি তদন্তের আওতায় থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ছাড়পত্র পেল, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। শুধু অপরাধমূলক রেকর্ডই নয়, অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও চরম অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। মালয়েশিয়ার শর্ত অনুযায়ী, একটি এজেন্সির গত ৫ বছরে অন্তত তিনটি দেশে তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, তালিকায় এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের মোট কর্মী পাঠানোর সংখ্যা চারশও ছাড়ায়নি। যেমন, অ্যাঙ্কর কেয়ার গ্লোবাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে মাত্র ৩৬০ জন কর্মী পাঠিয়েছে। সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল নামের আরেকটি সংস্থা গত তিন বছরে মাত্র ১১১ জন কর্মী বিদেশে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। এই অনভিজ্ঞ ও অখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো কোন জাদুবলে বড় বড় যোগ্যতাসম্পন্ন সংস্থাকে পেছনে ফেলে তালিকায় স্থান করে নিল, তা এখন জনশক্তি রপ্তানি খাতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, এই তালিকার পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গ। বিগত সরকারের সময় যেমন ১০ এজেন্সির সিন্ডিকেট ছিল, এবারও অনেকটা সেই পথেই হাঁটছে কর্তৃপক্ষ। আওয়ামী লীগ আমলের প্রভাবশালী নেতাদের বদলে এখন নতুন রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্টদের ডামি প্রতিষ্ঠান এই ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করছে। ফলে কর্মীরা ন্যায্য খরচে মালয়েশিয়া যেতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। গত ২০২২ সালের সিন্ডিকেটের প্রভাবে অভিবাসন ব্যয় পাঁচ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, এবারও তেমন পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন বায়রার সাবেক নেতৃবৃন্দ। বর্তমানে শ্রমবাজারটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও চালুর তোড়জোড় চলছে। তবে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনকারী এজেন্সিদের আধিপত্য বজায় থাকলে সাধারণ শ্রমিকদের শোষণ বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের একক এখতিয়ার বলে দাবি করা হলেও দেশের সুনাম রক্ষার্থে এবং শ্রমিকদের স্বার্থে এই ‘সিন্ডিকেট’ প্রথা ভেঙে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরি-কন্ঠ/মুয়াজ