পরিবেশ কন্ঠ

মানব পাচার ও আধুনিক দাসত্ব

বাংলাদেশের অভিবাসন সংকটের অন্ধকার দিক


প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

বাংলাদেশের অভিবাসন সংকটের অন্ধকার দিক
সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবসে উঠে এল আধুনিক দাসত্বের বীভৎস চিত্র; সাইবার স্ক্যাম থেকে ভূমধ্যসাগর কিংবা রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র—সর্বত্রই প্রতারণার জাল।

বিংশ শতাব্দীর চরম উৎকর্ষের যুগেও মানব পাচার বিশ্ব সভ্যতার এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে টিকে আছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা এখন আরও বেপরোয়া। ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’, যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। উন্নত জীবনের আশায় ভিটামাটি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমানো হাজারো তরুণ আজ বিদেশের মাটিতে পা রেখেই বুঝতে পারছেন তারা আসলে এক আধুনিক দাসত্বের নিগড়ে বন্দি হয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাচারের ধরনে এসেছে আমূল পরিবর্তন। দালালেরা এখন আর শুধু দুর্গম পথ বা সাগরপথের ওপর নির্ভর করছে না; তারা ব্যবহার করছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষিত তরুণদের কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড বা মিয়ানমারের ‘সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে’ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে যাওয়ার পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে অস্ত্রের মুখে অনলাইন জালিয়াতি ও প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হচ্ছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় গিয়েছেন, যাদের বড় অংশই কোনো চাকরি পাননি। ফিরে আসা ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের লোমহর্ষক চিত্র।

অন্যদিকে, ইউরোপে প্রবেশের মরিয়া চেষ্টায় ভূমধ্যসাগর হয়ে উঠছে বাংলাদেশিদের জন্য এক মৃত্যুফাঁদ। ফ্রন্টেক্সের তথ্যমতে, লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকায় বাংলাদেশিরা এখন বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে। লিবিয়ার মাফিয়াদের হাতে জিম্মি হয়ে কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার ঘটনা যেমন বাড়ছে, তেমনি উত্তাল সমুদ্রে সলিলসমাধি ঘটছে শত শত প্রাণ। মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও সিলেটের ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী যুবকরাই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথের প্রধান শিকার। কেবল মৃত্যু নয়, অনেকে ইতালিতে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমাতে গিয়ে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

নারীদের ক্ষেত্রেও চিত্রটি সমান ভয়াবহ। মধ্যপ্রাচ্যে পোশাক কারখানা বা গৃহকর্মীর কাজের আড়ালে অনেককেই দুবাই বা মালয়েশিয়ার ড্যান্স ক্লাব ও অনৈতিক পেশায় বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়া কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভনে বঙ্গোপসাগর দিয়ে পাচারও থেমে নেই। পাচারকারীরা এখন হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপ ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যেখানে আইনি নজরদারি সীমিত।

বাংলাদেশে এই সংকট ঘনীভূত হওয়ার অন্যতম কারণ পাচারসংক্রান্ত মামলার দীর্ঘসূত্রতা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে এবং সাজার হার অত্যন্ত হতাশাজনক। গত পাঁচ মাসে মাত্র ১৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, যার অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসামিরা খালাস পেয়ে গেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর তদারকি এবং আইনি প্রক্রিয়ায় দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এই অমানবিক দাসত্ব ও মৃত্যুযাত্রা থামানো সম্ভব হবে না।

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ

আপনার মতামত লিখুন

পরিবেশ কন্ঠ

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬


বাংলাদেশের অভিবাসন সংকটের অন্ধকার দিক

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬

featured Image

আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবসে উঠে এল আধুনিক দাসত্বের বীভৎস চিত্র; সাইবার স্ক্যাম থেকে ভূমধ্যসাগর কিংবা রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র—সর্বত্রই প্রতারণার জাল।

বিংশ শতাব্দীর চরম উৎকর্ষের যুগেও মানব পাচার বিশ্ব সভ্যতার এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে টিকে আছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা এখন আরও বেপরোয়া। ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’, যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। উন্নত জীবনের আশায় ভিটামাটি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমানো হাজারো তরুণ আজ বিদেশের মাটিতে পা রেখেই বুঝতে পারছেন তারা আসলে এক আধুনিক দাসত্বের নিগড়ে বন্দি হয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাচারের ধরনে এসেছে আমূল পরিবর্তন। দালালেরা এখন আর শুধু দুর্গম পথ বা সাগরপথের ওপর নির্ভর করছে না; তারা ব্যবহার করছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষিত তরুণদের কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড বা মিয়ানমারের ‘সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে’ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে যাওয়ার পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে অস্ত্রের মুখে অনলাইন জালিয়াতি ও প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হচ্ছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় গিয়েছেন, যাদের বড় অংশই কোনো চাকরি পাননি। ফিরে আসা ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের লোমহর্ষক চিত্র।

অন্যদিকে, ইউরোপে প্রবেশের মরিয়া চেষ্টায় ভূমধ্যসাগর হয়ে উঠছে বাংলাদেশিদের জন্য এক মৃত্যুফাঁদ। ফ্রন্টেক্সের তথ্যমতে, লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকায় বাংলাদেশিরা এখন বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে। লিবিয়ার মাফিয়াদের হাতে জিম্মি হয়ে কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার ঘটনা যেমন বাড়ছে, তেমনি উত্তাল সমুদ্রে সলিলসমাধি ঘটছে শত শত প্রাণ। মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও সিলেটের ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী যুবকরাই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথের প্রধান শিকার। কেবল মৃত্যু নয়, অনেকে ইতালিতে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমাতে গিয়ে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

নারীদের ক্ষেত্রেও চিত্রটি সমান ভয়াবহ। মধ্যপ্রাচ্যে পোশাক কারখানা বা গৃহকর্মীর কাজের আড়ালে অনেককেই দুবাই বা মালয়েশিয়ার ড্যান্স ক্লাব ও অনৈতিক পেশায় বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়া কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভনে বঙ্গোপসাগর দিয়ে পাচারও থেমে নেই। পাচারকারীরা এখন হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপ ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যেখানে আইনি নজরদারি সীমিত।

বাংলাদেশে এই সংকট ঘনীভূত হওয়ার অন্যতম কারণ পাচারসংক্রান্ত মামলার দীর্ঘসূত্রতা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে এবং সাজার হার অত্যন্ত হতাশাজনক। গত পাঁচ মাসে মাত্র ১৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, যার অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসামিরা খালাস পেয়ে গেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর তদারকি এবং আইনি প্রক্রিয়ায় দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এই অমানবিক দাসত্ব ও মৃত্যুযাত্রা থামানো সম্ভব হবে না।

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ


পরিবেশ কন্ঠ

সম্পাদক: ড. মোহাম্মদ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মীযানুর রহমান

কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ