মোবাইল ইন্টারনেট এখন আর কারও কাছে বাড়তি সুবিধা নয়, এটি প্রতিদিনের জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ হয়ে উঠেছে। ব্যাংকিং লেনদেন থেকে শুরু করে সন্তানের অনলাইন ক্লাস, চাকরির আবেদন কিংবা ছোট ব্যবসার হিসাব রাখা, সবকিছুতেই এখন এই একটি সংযোগের ওপর নির্ভর করতে হয়। অথচ মানুষের জীবনে এই সেবার প্রয়োজন যত বাড়ছে, গ্রাহকের ভোগান্তিও তত বাড়ছে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে চার মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় ৬৬ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের বড় অংশই নেটওয়ার্কের দুর্বলতা ও সেবার মান নিয়ে। এত বিপুল অভিযোগের পরও গ্রাহকের সেবায় বাস্তবে কতটা পরিবর্তন এসেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে স্বস্তির চেয়ে হতাশার চিত্রই বেশি চোখে পড়ে।
গ্রাহকের সবচেয়ে বড় অভিযোগের জায়গা হলো দাম বাড়া। গত দেড় বছরে দেশের চারটি প্রধান মোবাইল অপারেটরই বিভিন্ন মেয়াদের ডেটা প্যাকেজের দাম বাড়িয়েছে। কোনো কোনো প্যাকেজে দাম বেড়েছে অর্ধেকের বেশি। এতে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ডেটা ব্যবহারকারীদের মাসিক খরচ বেড়েছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে সরাসরি চাপ ফেলছে। অথচ এই সময় সরকার দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যান্ডউইথের খরচ কমানোর কথা জানিয়েছে এবং অপারেটরদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। তারপরও ডেটার দাম কমেনি, উল্টো বেড়েছে। অপারেটরদের দাবি, ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়াতে হয়েছে। ফলে সরকার ও অপারেটরদের বক্তব্যের এই পার্থক্যের চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ গ্রাহকের ওপর।
দাম বেড়েছে, কিন্তু সেবার মান বাড়েনি। স্বাধীনভাবে করা প্রথম মান যাচাইয়ে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। অপারেটরদের নিজস্ব দাবি করা কলড্রপের হার আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীন পরীক্ষায় পাওয়া হারের মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা কয়েক গুণ বেশি। দেশের বেশ কয়েকটি উপজেলায় বড় অপারেটরদেরও কোনো নেটওয়ার্ক কভারেজ নেই। প্রয়োজনীয় কারিগরি তথ্য সরবরাহে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বাধ্য হয়ে অপারেটরের নিজস্ব প্রক্রিয়াজাত তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এই চিত্র শুধু কারিগরি দুর্বলতার প্রমাণ নয়, এটি তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
গত এক বছরেই চার অপারেটরের নেটওয়ার্কে কোটি কোটিবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ফলে কথা বলার মাঝপথে বারবার লাইন কেটে যাওয়া গ্রাহকের নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। এই সমস্যার একটি বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক আলোচনায় ধরাই পড়ে না। শহরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার যেখানে অনেক বেশি, গ্রামে তা এখনো অর্ধেকের কম। ফোরজি নেটওয়ার্কের ব্যাপক প্রসারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অনেক গ্রামীণ এলাকায় বাস্তব গতি মেলে থ্রিজি বা টুজির মতো।
একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে একটি পিডিএফ ফাইল ডাউনলোড করতে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান নেটওয়ার্কের খোঁজে, একজন ফ্রিল্যান্সার সারা রাত জেগে কাজ শেষ করে সকালে ফাইল আপলোড করতে না পেরে গ্রাহক হারান, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ খুলতে না পেরে বিক্রি হাতছাড়া করেন। এমনকি জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এই দুর্বল সংযোগ প্রভাব ফেলছে, প্রত্যন্ত এলাকার একজন রোগীর পরীক্ষার রিপোর্ট শহরের চিকিৎসকের কাছে পাঠাতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। এ ঘটনাকে কি আর নিছক অনভিপ্রেত ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে? লাখো মানুষের জন্য এটি এখন নিত্যদিনের হয়রানির গল্প। বিশেষত দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় নেটওয়ার্ক টাওয়ারের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় এখনো অপ্রতুল। অবকাঠামোর এই ঘাটতিই মূলত শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্যের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূল সমস্যার শিকড় খুঁজতে গেলে দেখা যায়, প্রতিযোগিতার অভাব এবং নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করছে। দেশে মোবাইল অপারেটরের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় গ্রাহকের হাতে বিকল্প কম, ফলে অপারেটররা নিজেদের শর্তে অসংখ্য ধরনের প্যাকেজ তৈরি করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়। এত রকমের প্যাকেজের ভেতর থেকে সবচেয়ে উপযোগী ও ন্যায্য অপশনটি খুঁজে বের করা একজন সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে কার্যত অসম্ভব একটি কাজ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি হলো অব্যবহৃত ডেটার ভবিষ্যৎ। একজন গ্রাহক নির্দিষ্ট অর্থ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ডেটা কেনেন, কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অব্যবহৃত ডেটার সুবিধাও শেষ হয়ে যায়। কর্মব্যস্ততা, অসুস্থতা, বিদ্যুৎ বা নেটওয়ার্ক সমস্যা কিংবা একাধিক সিম ব্যবহারের কারণে অনেক গ্রাহকই কেনা ডেটার পুরোটা ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে গ্রাহকের কেনা ডেটার একটি অংশ কোনো কাজে আসে না। দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের ক্ষেত্রে এই হিসাব প্রতিবছর বিশাল অঙ্কে পৌঁছায়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে নির্দেশনা দিলেও শর্ত হলো একই প্যাকেজ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আবার কিনতে হবে, যা বাস্তবে খুব কম গ্রাহকই মনে রাখতে পারেন। ফলে সুবিধাটি কাগজে-কলমেই থেকে যায়, বাস্তবে গ্রাহকের কোনো উপকারে আসে না।
এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার পথ কঠিন নয়। বিশ্বের অনেক দেশে ডেটা রোলওভার সুবিধা চালু আছে। এতে অব্যবহৃত ডেটা পরবর্তী মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ হয়ে যায় এবং গ্রাহক তা ব্যবহার করতে পারেন। বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে যেমন কেনা ইউনিট শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়, মোবাইল ডেটার ক্ষেত্রেও এমন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কেনা ডেটা একটি ডিজিটাল ব্যালেন্স হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে এবং গ্রাহক প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে পারবেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট মেয়াদের কম দামের প্যাকেজের সঙ্গে মেয়াদবিহীন পূর্ণমূল্যের ডেটার ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে। এতে গ্রাহক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাকেজ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
প্রতিটি অপারেটরের বিলিং ব্যবস্থা নিয়মিত স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার। এতে গ্রাহক নিশ্চিত হতে পারবেন, তিনি যে পরিমাণ ডেটা ও মিনিট কিনছেন, তার সঠিক হিসাবই রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রাহকের অভিযোগের সমাধান করতে হবে। শুধু অভিযোগ গ্রহণ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। নেটওয়ার্ক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে প্রকৃত ফোরজি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কাগজে-কলমে কভারেজ দেখিয়ে মানুষের ভোগান্তি কমানো সম্ভব নয়। সেবার মান খারাপ হলে কার্যকর জরিমানার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান হবে না। এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করাও খুব কঠিন নয়। কারণ, গ্রাহকের ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য এমনিতেই ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকে। প্রয়োজন শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত এবং গ্রাহকের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা।
দেশ যখন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অন্যতম ভিত্তি হলো টেলিযোগাযোগ খাত। এই খাতে অস্বচ্ছতা, বাড়তি দাম ও নিম্নমানের সেবা থাকলে ডিজিটাল অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হবে। প্রযুক্তিনির্ভর দেশ গড়তে হলে গ্রাহকের এই ভোগান্তি আর উপেক্ষা করা যায় না। গ্রাহকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপারেটরদের ব্যবসায়িক স্বার্থও বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে এত দিন গ্রাহকের স্বার্থই বেশি উপেক্ষিত হয়েছে। তাই এখনই দুই পক্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা জরুরি। তা না হলে স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার বদলে শুধু একটি স্লোগান হয়েই থেকে যাবে।
বিষয় : উপসম্পাদকীয় ছাপা সংস্করণ মোবাইল ফোন

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মোবাইল ইন্টারনেট এখন আর কারও কাছে বাড়তি সুবিধা নয়, এটি প্রতিদিনের জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ হয়ে উঠেছে। ব্যাংকিং লেনদেন থেকে শুরু করে সন্তানের অনলাইন ক্লাস, চাকরির আবেদন কিংবা ছোট ব্যবসার হিসাব রাখা, সবকিছুতেই এখন এই একটি সংযোগের ওপর নির্ভর করতে হয়। অথচ মানুষের জীবনে এই সেবার প্রয়োজন যত বাড়ছে, গ্রাহকের ভোগান্তিও তত বাড়ছে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে চার মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় ৬৬ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের বড় অংশই নেটওয়ার্কের দুর্বলতা ও সেবার মান নিয়ে। এত বিপুল অভিযোগের পরও গ্রাহকের সেবায় বাস্তবে কতটা পরিবর্তন এসেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে স্বস্তির চেয়ে হতাশার চিত্রই বেশি চোখে পড়ে।
গ্রাহকের সবচেয়ে বড় অভিযোগের জায়গা হলো দাম বাড়া। গত দেড় বছরে দেশের চারটি প্রধান মোবাইল অপারেটরই বিভিন্ন মেয়াদের ডেটা প্যাকেজের দাম বাড়িয়েছে। কোনো কোনো প্যাকেজে দাম বেড়েছে অর্ধেকের বেশি। এতে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ডেটা ব্যবহারকারীদের মাসিক খরচ বেড়েছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে সরাসরি চাপ ফেলছে। অথচ এই সময় সরকার দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যান্ডউইথের খরচ কমানোর কথা জানিয়েছে এবং অপারেটরদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। তারপরও ডেটার দাম কমেনি, উল্টো বেড়েছে। অপারেটরদের দাবি, ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়াতে হয়েছে। ফলে সরকার ও অপারেটরদের বক্তব্যের এই পার্থক্যের চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ গ্রাহকের ওপর।
দাম বেড়েছে, কিন্তু সেবার মান বাড়েনি। স্বাধীনভাবে করা প্রথম মান যাচাইয়ে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। অপারেটরদের নিজস্ব দাবি করা কলড্রপের হার আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীন পরীক্ষায় পাওয়া হারের মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা কয়েক গুণ বেশি। দেশের বেশ কয়েকটি উপজেলায় বড় অপারেটরদেরও কোনো নেটওয়ার্ক কভারেজ নেই। প্রয়োজনীয় কারিগরি তথ্য সরবরাহে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বাধ্য হয়ে অপারেটরের নিজস্ব প্রক্রিয়াজাত তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এই চিত্র শুধু কারিগরি দুর্বলতার প্রমাণ নয়, এটি তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
গত এক বছরেই চার অপারেটরের নেটওয়ার্কে কোটি কোটিবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ফলে কথা বলার মাঝপথে বারবার লাইন কেটে যাওয়া গ্রাহকের নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। এই সমস্যার একটি বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক আলোচনায় ধরাই পড়ে না। শহরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার যেখানে অনেক বেশি, গ্রামে তা এখনো অর্ধেকের কম। ফোরজি নেটওয়ার্কের ব্যাপক প্রসারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অনেক গ্রামীণ এলাকায় বাস্তব গতি মেলে থ্রিজি বা টুজির মতো।
একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে একটি পিডিএফ ফাইল ডাউনলোড করতে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান নেটওয়ার্কের খোঁজে, একজন ফ্রিল্যান্সার সারা রাত জেগে কাজ শেষ করে সকালে ফাইল আপলোড করতে না পেরে গ্রাহক হারান, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ খুলতে না পেরে বিক্রি হাতছাড়া করেন। এমনকি জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এই দুর্বল সংযোগ প্রভাব ফেলছে, প্রত্যন্ত এলাকার একজন রোগীর পরীক্ষার রিপোর্ট শহরের চিকিৎসকের কাছে পাঠাতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। এ ঘটনাকে কি আর নিছক অনভিপ্রেত ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে? লাখো মানুষের জন্য এটি এখন নিত্যদিনের হয়রানির গল্প। বিশেষত দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় নেটওয়ার্ক টাওয়ারের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় এখনো অপ্রতুল। অবকাঠামোর এই ঘাটতিই মূলত শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্যের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূল সমস্যার শিকড় খুঁজতে গেলে দেখা যায়, প্রতিযোগিতার অভাব এবং নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা একসঙ্গে কাজ করছে। দেশে মোবাইল অপারেটরের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় গ্রাহকের হাতে বিকল্প কম, ফলে অপারেটররা নিজেদের শর্তে অসংখ্য ধরনের প্যাকেজ তৈরি করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়। এত রকমের প্যাকেজের ভেতর থেকে সবচেয়ে উপযোগী ও ন্যায্য অপশনটি খুঁজে বের করা একজন সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে কার্যত অসম্ভব একটি কাজ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি হলো অব্যবহৃত ডেটার ভবিষ্যৎ। একজন গ্রাহক নির্দিষ্ট অর্থ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ডেটা কেনেন, কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অব্যবহৃত ডেটার সুবিধাও শেষ হয়ে যায়। কর্মব্যস্ততা, অসুস্থতা, বিদ্যুৎ বা নেটওয়ার্ক সমস্যা কিংবা একাধিক সিম ব্যবহারের কারণে অনেক গ্রাহকই কেনা ডেটার পুরোটা ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে গ্রাহকের কেনা ডেটার একটি অংশ কোনো কাজে আসে না। দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের ক্ষেত্রে এই হিসাব প্রতিবছর বিশাল অঙ্কে পৌঁছায়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে নির্দেশনা দিলেও শর্ত হলো একই প্যাকেজ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আবার কিনতে হবে, যা বাস্তবে খুব কম গ্রাহকই মনে রাখতে পারেন। ফলে সুবিধাটি কাগজে-কলমেই থেকে যায়, বাস্তবে গ্রাহকের কোনো উপকারে আসে না।
এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার পথ কঠিন নয়। বিশ্বের অনেক দেশে ডেটা রোলওভার সুবিধা চালু আছে। এতে অব্যবহৃত ডেটা পরবর্তী মাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ হয়ে যায় এবং গ্রাহক তা ব্যবহার করতে পারেন। বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে যেমন কেনা ইউনিট শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়, মোবাইল ডেটার ক্ষেত্রেও এমন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কেনা ডেটা একটি ডিজিটাল ব্যালেন্স হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে এবং গ্রাহক প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে পারবেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট মেয়াদের কম দামের প্যাকেজের সঙ্গে মেয়াদবিহীন পূর্ণমূল্যের ডেটার ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে। এতে গ্রাহক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাকেজ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
প্রতিটি অপারেটরের বিলিং ব্যবস্থা নিয়মিত স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার। এতে গ্রাহক নিশ্চিত হতে পারবেন, তিনি যে পরিমাণ ডেটা ও মিনিট কিনছেন, তার সঠিক হিসাবই রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রাহকের অভিযোগের সমাধান করতে হবে। শুধু অভিযোগ গ্রহণ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। নেটওয়ার্ক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে প্রকৃত ফোরজি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কাগজে-কলমে কভারেজ দেখিয়ে মানুষের ভোগান্তি কমানো সম্ভব নয়। সেবার মান খারাপ হলে কার্যকর জরিমানার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান হবে না। এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করাও খুব কঠিন নয়। কারণ, গ্রাহকের ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য এমনিতেই ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকে। প্রয়োজন শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত এবং গ্রাহকের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা।
দেশ যখন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অন্যতম ভিত্তি হলো টেলিযোগাযোগ খাত। এই খাতে অস্বচ্ছতা, বাড়তি দাম ও নিম্নমানের সেবা থাকলে ডিজিটাল অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হবে। প্রযুক্তিনির্ভর দেশ গড়তে হলে গ্রাহকের এই ভোগান্তি আর উপেক্ষা করা যায় না। গ্রাহকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপারেটরদের ব্যবসায়িক স্বার্থও বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে এত দিন গ্রাহকের স্বার্থই বেশি উপেক্ষিত হয়েছে। তাই এখনই দুই পক্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা জরুরি। তা না হলে স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার বদলে শুধু একটি স্লোগান হয়েই থেকে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন