পরিবেশ কন্ঠ

অহিংসতা ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী: শান্তির পথে সম্মিলিত প্রচেষ্টা



অহিংসতা ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী: শান্তির পথে সম্মিলিত প্রচেষ্টা
পরিবেশ কন্ঠ

মানবসভ্যতার ইতিহাস একদিকে যেমন সৃষ্টি, জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশের ইতিহাস, তেমনি অন্যদিকে যুদ্ধ, রক্তপাত ও সহিংসতার করুণ বৃত্তান্ত। সমকালীন বিশ্বে যখন প্রায় প্রতিনিয়ত সশস্ত্র সংঘর্ষ, সন্ত্রাসবাদ ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটছে, তখন অহিংসা ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবীর প্রশ্নটি নিছক একটি নৈতিক প্রত্যয় নয়, বরং মানব অস্তিত্বের অনিবার্য শর্ত হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে—যেখানে সহিংসতা মানবপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে হয়, সেখানে অহিংসার দর্শন কি কেবল একটি ইউটোপিয়ান স্বপ্ন? নাকি তা মানবমুক্তির এক বাস্তব ও যুক্তিসঙ্গত পথ?

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বললে, অহিংসা কেবল যুদ্ধ-বিরোধী অবস্থান নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ জীবনদর্শন—যা মানুষের অন্তর্নিহিত সহিংস প্রবণতাকে চিহ্নিত করে, তাকে রূপান্তরিত করে এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অন্বেষায় পরিণত করে। 

অহিংসার মূল দর্শন এই স্বীকারোক্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে যে, কোনো কাজ বা চিন্তা—যা অন্যের ক্ষতি বা দুঃখের কারণ হয়—নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু অহিংসা কেবল শারীরিক সহিংসতার অনুপস্থিতি নয়; এটি মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহিংসতার বিরুদ্ধেও একটি সক্রিয় অবস্থান। এখানেই অহিংসা নিষ্ক্রিয়তার বিপরীত—এটি একটি সক্রিয়, সৃজনশীল ও রূপান্তরমূলক শক্তি।

মহাত্মা গান্ধীর 'সত্যাগ্রহ', মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের 'স্বাধীনতা ও ন্যায়' আন্দোলন—এগুলো প্রমাণ করে যে অহিংসা কেবল নৈতিক আদর্শ নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী কৌশল। গান্ধী বিশ্বাস করতেন, সহিংসতা প্রতিরোধের চেয়ে সহিংসতার রূপান্তর বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন, "অন্ধকারকে অন্ধকার দিয়ে দূর করা যায় না; তা সম্ভব কেবল আলো দিয়ে।" এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত দার্শনিক তাৎপর্য হলো—সহিংসতা কখনোই সহিংসতার মাধ্যমে নির্মূল হয় না; তা হয় কেবল অহিংসার সৃজনশীল শক্তির মাধ্যমে।

আর্জেন্টিনার দার্শনিক, লেখক ও চিন্তাবিদ মারিও লুইস রদ্রিগেজ কোবোস—যিনি 'সিলো' নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত—অহিংসার দর্শনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তাঁর দর্শনের মূল বাণী: "মানুষের মূল্যই প্রধান" (The human being as the supreme value)। এই চিন্তার তাৎপর্য হলো—কোনো ধর্ম, রাষ্ট্র, অর্থনীতি বা আদর্শ মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। যখন কোনো আদর্শ মানুষের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখনই যুদ্ধ, বৈষম্য ও সহিংসতার সৃষ্টি হয়। সিলো অহিংসাকে দুটি স্তরে বিভক্ত করেছেন। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ অহিংসা: এটি মানুষের নিজের মনের ভেতরের শান্তি। নিজের প্রতি সৎ থাকা, ঘৃণা ও ক্ষোভ দূর করা এবং মানসিক দ্বন্দ্ব কমিয়ে আনার মাধ্যমে এটি অর্জিত হয়। সিলোর মতে, মনের ভেতর শান্তি না থাকলে বাইরে অহিংসা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য—যে ব্যক্তি নিজের সাথে সহিংস, সে অন্যের সাথেও সহিংস হবে। দ্বিতীয়ত, বাহ্যিক অহিংসা: এটি সমাজে অন্য মানুষের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে অহিংস থাকা। কোনো অবস্থাতেই অন্যের ক্ষতি না করা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য অহিংস পদ্ধতিতে লড়াই করা। সিলোর দর্শন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অহিংসা পরস্পর সম্পর্কিত—একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ।

সিলোর অহিংসার মর্মবাণী পৃথিবীর মানব সংস্কৃতিতে "স্বর্ণালী নীতি" (Golden Rule) নামে আখ্যা পেয়েছে: "অন্যের সাথে ঠিক তেমন আচরণ করো, যেমন আচরণ তুমি নিজের জন্য প্রত্যাশা করো।" এই নীতিটি বিশ্বের প্রায় সব ধর্ম ও দর্শনে কম-বেশি ভিন্ন ভাষায় উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু সিলোর অবদান হলো—তিনি এই নীতিকে কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক, রাজনৈতিক ও কাঠামোগত স্তরে প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।

যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গঠনের জন্য প্রথমে যুদ্ধের কারণগুলো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বেশিরভাগ যুদ্ধের মূল কারণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয়। কিন্তু দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, যুদ্ধের গভীরে রয়েছে মানুষের অস্তিত্বগত ভয়, ক্ষমতার লোভ এবং 'অপর'-কে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা।

যুদ্ধ কেবল জীবনের ক্ষতি করে না; এটি সমাজের শান্তি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানসিক সুস্থতাকেও ধ্বংস করে। যুদ্ধ মানবসভ্যতার একটি ব্যর্থতা—এটি প্রমাণ করে যে মানুষ এখনও নিজের সহিংস প্রবণতাকে জয় করতে পারেনি। অহিংসা তাই কেবল একটি নৈতিক পছন্দ নয়, বরং মানবসভ্যতার টিকে থাকার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত।

অহিংসা ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী-শ্লোগান নিয়ে 'দ্য কমিউনিটি ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট' বিশ্বময় কাজ করছে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত শান্তির বার্তা নিয়ে সংস্থাটি বিশ্বব্যাপি 'ফোর্থ ওয়াল্ড মার্চ ফর পিস অ্যান্ড নন ভায়োলেন্স' শিরোনামে বর্ণাঢ্য র‌্যালি, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামসহ ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করবে। বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা 'হিউম্যানিস্ট সোসাইটি' ইতোমধ্যে গত বছর 'থার্ড ওয়াল্ড মার্চ ফর পিস অ্যান্ড নন ভায়োলেন্স' উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিসহ বিভিন্ন অডিটরিয়ামে সেমিনার ও র‌্যালির আয়োজন করেছে। আয়োজিত হয়েছে পাকিস্তান, নেপাল-বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ট্রায়েঙ্গুলার ফুটবল টুর্নামেন্ট। এবছরও বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

এই ধরনের কর্মসূচি কেবল প্রতীকী নয়; এগুলো অহিংসার দর্শনকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা। দার্শনিকভাবে বললে, এগুলো 'সক্রিয় অহিংসা'-এর উদাহরণ—যা কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়, বরং শান্তির সক্রিয় নির্মাণ।

অহিংসতা ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গঠনে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। বিভিন্ন দেশ যখন একে অপরকে সম্মান করে, সংলাপ স্থাপন করে এবং সমস্যাগুলির শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজে, তখন যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে আসে। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলি শান্তির প্রচার ও সশস্ত্র সংঘর্ষ বন্ধ করার জন্য অনেক কাজ করছে, তবে এক্ষেত্রে আরও সচেতনতা, সহযোগিতা ও সঠিক নেতৃত্বের প্রয়োজন।

দার্শনিকভাবে বললে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে 'শক্তি-ভারসাম্য' (Balance of Power) এর পরিবর্তে 'ন্যায়বিচার-ভারসাম্য' (Balance of Justice) এর উপর প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। যখন রাষ্ট্রগুলি নিজেদের স্বার্থের চেয়ে মানবতার স্বার্থকে বড় করে দেখবে, তখনই যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী সম্ভব হবে।

প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যেও শান্তির বীজ বুনে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সমাজে সহানুভূতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে অহিংসতার দর্শনকে বাস্তবায়িত করা সম্ভব। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশুদের অহিংসা, শান্তি ও মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাইবে না।

সিলোর ভাষায়—"মানুষের মূল্যই প্রধান"—এই সত্যটি যদি আমরা সবাই হৃদয়ঙ্গম করি, তবে যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী কেবল স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা হয়ে উঠবে।

লেখক: প্রেসিডেন্ট, হিউম্যানিস্ট সোসাইটি

আপনার মতামত লিখুন

পরিবেশ কন্ঠ

রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


অহিংসতা ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী: শান্তির পথে সম্মিলিত প্রচেষ্টা

প্রকাশের তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মানবসভ্যতার ইতিহাস একদিকে যেমন সৃষ্টি, জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশের ইতিহাস, তেমনি অন্যদিকে যুদ্ধ, রক্তপাত ও সহিংসতার করুণ বৃত্তান্ত। সমকালীন বিশ্বে যখন প্রায় প্রতিনিয়ত সশস্ত্র সংঘর্ষ, সন্ত্রাসবাদ ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটছে, তখন অহিংসা ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবীর প্রশ্নটি নিছক একটি নৈতিক প্রত্যয় নয়, বরং মানব অস্তিত্বের অনিবার্য শর্ত হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে—যেখানে সহিংসতা মানবপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে হয়, সেখানে অহিংসার দর্শন কি কেবল একটি ইউটোপিয়ান স্বপ্ন? নাকি তা মানবমুক্তির এক বাস্তব ও যুক্তিসঙ্গত পথ?

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বললে, অহিংসা কেবল যুদ্ধ-বিরোধী অবস্থান নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ জীবনদর্শন—যা মানুষের অন্তর্নিহিত সহিংস প্রবণতাকে চিহ্নিত করে, তাকে রূপান্তরিত করে এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অন্বেষায় পরিণত করে। 

অহিংসার মূল দর্শন এই স্বীকারোক্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে যে, কোনো কাজ বা চিন্তা—যা অন্যের ক্ষতি বা দুঃখের কারণ হয়—নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু অহিংসা কেবল শারীরিক সহিংসতার অনুপস্থিতি নয়; এটি মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহিংসতার বিরুদ্ধেও একটি সক্রিয় অবস্থান। এখানেই অহিংসা নিষ্ক্রিয়তার বিপরীত—এটি একটি সক্রিয়, সৃজনশীল ও রূপান্তরমূলক শক্তি।

মহাত্মা গান্ধীর 'সত্যাগ্রহ', মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের 'স্বাধীনতা ও ন্যায়' আন্দোলন—এগুলো প্রমাণ করে যে অহিংসা কেবল নৈতিক আদর্শ নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী কৌশল। গান্ধী বিশ্বাস করতেন, সহিংসতা প্রতিরোধের চেয়ে সহিংসতার রূপান্তর বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন, "অন্ধকারকে অন্ধকার দিয়ে দূর করা যায় না; তা সম্ভব কেবল আলো দিয়ে।" এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত দার্শনিক তাৎপর্য হলো—সহিংসতা কখনোই সহিংসতার মাধ্যমে নির্মূল হয় না; তা হয় কেবল অহিংসার সৃজনশীল শক্তির মাধ্যমে।

আর্জেন্টিনার দার্শনিক, লেখক ও চিন্তাবিদ মারিও লুইস রদ্রিগেজ কোবোস—যিনি 'সিলো' নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত—অহিংসার দর্শনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তাঁর দর্শনের মূল বাণী: "মানুষের মূল্যই প্রধান" (The human being as the supreme value)। এই চিন্তার তাৎপর্য হলো—কোনো ধর্ম, রাষ্ট্র, অর্থনীতি বা আদর্শ মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। যখন কোনো আদর্শ মানুষের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখনই যুদ্ধ, বৈষম্য ও সহিংসতার সৃষ্টি হয়। সিলো অহিংসাকে দুটি স্তরে বিভক্ত করেছেন। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ অহিংসা: এটি মানুষের নিজের মনের ভেতরের শান্তি। নিজের প্রতি সৎ থাকা, ঘৃণা ও ক্ষোভ দূর করা এবং মানসিক দ্বন্দ্ব কমিয়ে আনার মাধ্যমে এটি অর্জিত হয়। সিলোর মতে, মনের ভেতর শান্তি না থাকলে বাইরে অহিংসা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য—যে ব্যক্তি নিজের সাথে সহিংস, সে অন্যের সাথেও সহিংস হবে। দ্বিতীয়ত, বাহ্যিক অহিংসা: এটি সমাজে অন্য মানুষের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে অহিংস থাকা। কোনো অবস্থাতেই অন্যের ক্ষতি না করা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য অহিংস পদ্ধতিতে লড়াই করা। সিলোর দর্শন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অহিংসা পরস্পর সম্পর্কিত—একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ।

সিলোর অহিংসার মর্মবাণী পৃথিবীর মানব সংস্কৃতিতে "স্বর্ণালী নীতি" (Golden Rule) নামে আখ্যা পেয়েছে: "অন্যের সাথে ঠিক তেমন আচরণ করো, যেমন আচরণ তুমি নিজের জন্য প্রত্যাশা করো।" এই নীতিটি বিশ্বের প্রায় সব ধর্ম ও দর্শনে কম-বেশি ভিন্ন ভাষায় উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু সিলোর অবদান হলো—তিনি এই নীতিকে কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক, রাজনৈতিক ও কাঠামোগত স্তরে প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।

যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গঠনের জন্য প্রথমে যুদ্ধের কারণগুলো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বেশিরভাগ যুদ্ধের মূল কারণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয়। কিন্তু দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, যুদ্ধের গভীরে রয়েছে মানুষের অস্তিত্বগত ভয়, ক্ষমতার লোভ এবং 'অপর'-কে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা।

যুদ্ধ কেবল জীবনের ক্ষতি করে না; এটি সমাজের শান্তি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানসিক সুস্থতাকেও ধ্বংস করে। যুদ্ধ মানবসভ্যতার একটি ব্যর্থতা—এটি প্রমাণ করে যে মানুষ এখনও নিজের সহিংস প্রবণতাকে জয় করতে পারেনি। অহিংসা তাই কেবল একটি নৈতিক পছন্দ নয়, বরং মানবসভ্যতার টিকে থাকার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত।

অহিংসা ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী-শ্লোগান নিয়ে 'দ্য কমিউনিটি ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট' বিশ্বময় কাজ করছে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত শান্তির বার্তা নিয়ে সংস্থাটি বিশ্বব্যাপি 'ফোর্থ ওয়াল্ড মার্চ ফর পিস অ্যান্ড নন ভায়োলেন্স' শিরোনামে বর্ণাঢ্য র‌্যালি, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামসহ ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করবে। বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা 'হিউম্যানিস্ট সোসাইটি' ইতোমধ্যে গত বছর 'থার্ড ওয়াল্ড মার্চ ফর পিস অ্যান্ড নন ভায়োলেন্স' উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিসহ বিভিন্ন অডিটরিয়ামে সেমিনার ও র‌্যালির আয়োজন করেছে। আয়োজিত হয়েছে পাকিস্তান, নেপাল-বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ট্রায়েঙ্গুলার ফুটবল টুর্নামেন্ট। এবছরও বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

এই ধরনের কর্মসূচি কেবল প্রতীকী নয়; এগুলো অহিংসার দর্শনকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা। দার্শনিকভাবে বললে, এগুলো 'সক্রিয় অহিংসা'-এর উদাহরণ—যা কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়, বরং শান্তির সক্রিয় নির্মাণ।

অহিংসতা ও যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী গঠনে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। বিভিন্ন দেশ যখন একে অপরকে সম্মান করে, সংলাপ স্থাপন করে এবং সমস্যাগুলির শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজে, তখন যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে আসে। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলি শান্তির প্রচার ও সশস্ত্র সংঘর্ষ বন্ধ করার জন্য অনেক কাজ করছে, তবে এক্ষেত্রে আরও সচেতনতা, সহযোগিতা ও সঠিক নেতৃত্বের প্রয়োজন।

দার্শনিকভাবে বললে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে 'শক্তি-ভারসাম্য' (Balance of Power) এর পরিবর্তে 'ন্যায়বিচার-ভারসাম্য' (Balance of Justice) এর উপর প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। যখন রাষ্ট্রগুলি নিজেদের স্বার্থের চেয়ে মানবতার স্বার্থকে বড় করে দেখবে, তখনই যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী সম্ভব হবে।

প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যেও শান্তির বীজ বুনে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সমাজে সহানুভূতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে অহিংসতার দর্শনকে বাস্তবায়িত করা সম্ভব। শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশুদের অহিংসা, শান্তি ও মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাইবে না।

সিলোর ভাষায়—"মানুষের মূল্যই প্রধান"—এই সত্যটি যদি আমরা সবাই হৃদয়ঙ্গম করি, তবে যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী কেবল স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা হয়ে উঠবে।

লেখক: প্রেসিডেন্ট, হিউম্যানিস্ট সোসাইটি


পরিবেশ কন্ঠ

সম্পাদক: ড. মোহাম্মদ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মীযানুর রহমান

কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ