পরিবেশ কন্ঠ

খাল পুনর্খননে প্রাণ ফিরল তিন বিলে


প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

খাল পুনর্খননে প্রাণ ফিরল তিন বিলে
এক যুগ পর জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেলেন কুড়িগ্রামের কয়েকশ কৃষক

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা অসহনীয় জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে অবশেষে মুক্তি মিলেছে। স্থানীয় প্রশাসনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি মৃতপ্রায় খাল পুনর্খননের মাধ্যমে প্রাণ ফিরে পেয়েছে তিনটি বিশাল বিল। এক সময়ের পরিত্যক্ত ও পানিবন্দি সুরির ডারা বিল, ভুতানীর বিল এবং কারবালার বিলের শত শত একর জমিতে এখন আমন আবাদের রঙিন স্বপ্ন বুনছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে পানিনিষ্কাশনের পথ সুগম হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে।

উলিপুর পৌরসভার আব্দুল হাকিম মৌজার ডারারপাড় গ্রাম দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি এক সময় বুড়ি তিস্তার সাথে সংযুক্ত ছিল। তবে পলি জমে ও দীর্ঘকালীন সংস্কারের অভাবে গত ১২ বছর ধরে খালটি প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। এর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পার্শ্ববর্তী বিলগুলো উপচে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। এই পরিস্থিতির কারণে ওই অঞ্চলের কৃষকরা আমন চাষ থেকে বঞ্চিত হতেন; কোনো রকমে কেবল বোরো আবাদ করা সম্ভব হতো। বছরের সিংহভাগ সময় জমি পানির নিচে পড়ে থাকায় স্থানীয়দের অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী ছিল।

সম্প্রতি সরকারের ‘অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি)’ আওতায় প্রায় সাড়ে ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে খালের তিন কিলোমিটার অংশ পুনর্খনন করা হয়েছে। গত ১০ মে শুরু হওয়া এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ হয় ৩০ জুন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু যে পানির প্রবাহ নিশ্চিত হয়েছে তা-ই নয়, বরং ১১৯ জন স্থানীয় অতিদরিদ্র মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও খালের পাড় মজবুত করার উদ্দেশ্যে দুই পাশে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খালের দুপাশের কৃষকদের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। ডারার পাড় গ্রামের বয়োবৃদ্ধ কৃষক মো. তোফাজ্জল হোসেন (৬৫) আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, তার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া পাঁচ বিঘা জমি বছরের পর বছর পানির নিচে পড়ে থাকত। তিনি বলেন, “বাপের তন পাঁচ বিঘা জমি পাইছি, কিন্তু সারা জীবন জলাবদ্ধতার কারণে আবাদ করবার পাই নাই। এবার খাল কাটার পর পানি নাই, এখন হামরা আমনের আবাদ করমো।” একই সুর শোনা গেল ৮০ বছর বয়সী বাদশা মিয়ার কণ্ঠেও। তিনি জানান, তার চার একর জমি সারা বছর পানিতে ডুবে থাকত, কিন্তু এবার তিনি স্বস্তিতে চাষাবাদ করতে পারছেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা খন্দকার ফিজানুর রহমান এই উদ্যোগের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে বলেন, খালের পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন কৃষকরা শুধু জলাবদ্ধতা থেকেই মুক্তি পাননি, বরং শুষ্ক মৌসুমে এই পানি সেচ কাজেও ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যদিকে, উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম আরিফ জানান, দীর্ঘদিনের পলি অপসারণের ফলে এলাকাটি এখন কৃষিবান্ধব হয়ে উঠেছে। খালের সৌন্দর্য বর্ধন ও পরিবেশ রক্ষায় পাড়ে গাছ লাগানো হয়েছে, যা স্থানীয়দের প্রশান্তি দেবে।

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ

আপনার মতামত লিখুন

পরিবেশ কন্ঠ

বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬


খাল পুনর্খননে প্রাণ ফিরল তিন বিলে

প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা অসহনীয় জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে অবশেষে মুক্তি মিলেছে। স্থানীয় প্রশাসনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি মৃতপ্রায় খাল পুনর্খননের মাধ্যমে প্রাণ ফিরে পেয়েছে তিনটি বিশাল বিল। এক সময়ের পরিত্যক্ত ও পানিবন্দি সুরির ডারা বিল, ভুতানীর বিল এবং কারবালার বিলের শত শত একর জমিতে এখন আমন আবাদের রঙিন স্বপ্ন বুনছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলে পানিনিষ্কাশনের পথ সুগম হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে।

উলিপুর পৌরসভার আব্দুল হাকিম মৌজার ডারারপাড় গ্রাম দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি এক সময় বুড়ি তিস্তার সাথে সংযুক্ত ছিল। তবে পলি জমে ও দীর্ঘকালীন সংস্কারের অভাবে গত ১২ বছর ধরে খালটি প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। এর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পার্শ্ববর্তী বিলগুলো উপচে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। এই পরিস্থিতির কারণে ওই অঞ্চলের কৃষকরা আমন চাষ থেকে বঞ্চিত হতেন; কোনো রকমে কেবল বোরো আবাদ করা সম্ভব হতো। বছরের সিংহভাগ সময় জমি পানির নিচে পড়ে থাকায় স্থানীয়দের অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী ছিল।

সম্প্রতি সরকারের ‘অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি)’ আওতায় প্রায় সাড়ে ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে খালের তিন কিলোমিটার অংশ পুনর্খনন করা হয়েছে। গত ১০ মে শুরু হওয়া এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ হয় ৩০ জুন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু যে পানির প্রবাহ নিশ্চিত হয়েছে তা-ই নয়, বরং ১১৯ জন স্থানীয় অতিদরিদ্র মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও খালের পাড় মজবুত করার উদ্দেশ্যে দুই পাশে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খালের দুপাশের কৃষকদের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। ডারার পাড় গ্রামের বয়োবৃদ্ধ কৃষক মো. তোফাজ্জল হোসেন (৬৫) আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, তার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া পাঁচ বিঘা জমি বছরের পর বছর পানির নিচে পড়ে থাকত। তিনি বলেন, “বাপের তন পাঁচ বিঘা জমি পাইছি, কিন্তু সারা জীবন জলাবদ্ধতার কারণে আবাদ করবার পাই নাই। এবার খাল কাটার পর পানি নাই, এখন হামরা আমনের আবাদ করমো।” একই সুর শোনা গেল ৮০ বছর বয়সী বাদশা মিয়ার কণ্ঠেও। তিনি জানান, তার চার একর জমি সারা বছর পানিতে ডুবে থাকত, কিন্তু এবার তিনি স্বস্তিতে চাষাবাদ করতে পারছেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা খন্দকার ফিজানুর রহমান এই উদ্যোগের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে বলেন, খালের পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন কৃষকরা শুধু জলাবদ্ধতা থেকেই মুক্তি পাননি, বরং শুষ্ক মৌসুমে এই পানি সেচ কাজেও ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যদিকে, উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম আরিফ জানান, দীর্ঘদিনের পলি অপসারণের ফলে এলাকাটি এখন কৃষিবান্ধব হয়ে উঠেছে। খালের সৌন্দর্য বর্ধন ও পরিবেশ রক্ষায় পাড়ে গাছ লাগানো হয়েছে, যা স্থানীয়দের প্রশান্তি দেবে।

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ


পরিবেশ কন্ঠ

সম্পাদক: ড. মোহাম্মদ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মীযানুর রহমান

কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ