পরিবেশ কন্ঠ

ঢাকার নীরব এলাকায় শব্দদূষণ: আইন বনাম বাস্তবতা


প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

ঢাকার নীরব এলাকায় শব্দদূষণ: আইন বনাম বাস্তবতা
সংগৃহীত

কঠোর সাজার বিধান ও বিশেষ অঞ্চল ঘোষণার পরও ঢাকার রাজপথে কমছে না হর্নের দাপট; শিশুদের শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানী ঢাকার বুকে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য বিরাজ করছে। একদিকে খাতা-কলমে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে ‘নীরব’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, অন্যদিকে রাজপথের বিকট হর্নের আওয়াজে সাধারণ মানুষের কান পাতা দায়। গত বছরের ডিসেম্বরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চারপাশসহ সচিবালয়, আগারগাঁও, সংসদ ভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এলাকাকে নীরব অঞ্চল ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনকেও একই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তবে বাস্তবে এই ঘোষণা কেবলই দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

গবেষণার তথ্য বলছে, এই নীরব এলাকাগুলোতে শব্দের মাত্রা সহনীয় সীমার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ক্যাপস-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সচিবালয় ও সংসদ ভবন এলাকায় শব্দের গড় মাত্রা প্রায় ৯৭ থেকে ১০০ ডেসিবেল, যেখানে দিনের বেলা গ্রহণযোগ্য মাত্রা সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবেল হওয়ার কথা। এমনকি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশের মুখেও শব্দদূষণ হ্রাসের পরিবর্তে উল্টো বেড়েছে। গত ২০২৩ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ঢাকার কোনো আবাসিক বা নীরব এলাকাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না। ফলে প্রায় ৯ লাখ নগরবাসী ৭০ ডেসিবেলের বেশি শব্দের মধ্যে বসবাস করে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন করেছে। এতে নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহারের দায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড এবং অবৈধ হর্ন উৎপাদনের জন্য দুই বছরের কারাদণ্ডের মতো কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি ট্রাফিক সার্জেন্টদের ঘটনাস্থলেই জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে কেবল আইনের প্রয়োগ করে এই নৈরাজ্য থামানো যাচ্ছে না। চালকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং যত্রতত্র হর্ন বাজানোর মানসিকতা এই দূষণকে আরও উসকে দিচ্ছে। তীব্র এই শব্দের কারণে শিশুদের বিকাশে যেমন বাধার সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি বড়দের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ ও অনিদ্রার মতো দীর্ঘমেয়াদী রোগ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অসম্ভব। ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশ বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে শব্দ সৃষ্টিকারী যানবাহন শনাক্ত করার পরিকল্পনা করছে। দিনভর শব্দের মাঝে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক ট্রাফিক পুলিশ সদস্যও শ্রবণশক্তি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। এই জটিল সংকটের সমাধান খুঁজতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দেশব্যাপী সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চালকদের ধৈর্যশীল হওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ

আপনার মতামত লিখুন

পরিবেশ কন্ঠ

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ঢাকার নীরব এলাকায় শব্দদূষণ: আইন বনাম বাস্তবতা

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

কঠোর সাজার বিধান ও বিশেষ অঞ্চল ঘোষণার পরও ঢাকার রাজপথে কমছে না হর্নের দাপট; শিশুদের শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানী ঢাকার বুকে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য বিরাজ করছে। একদিকে খাতা-কলমে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে ‘নীরব’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, অন্যদিকে রাজপথের বিকট হর্নের আওয়াজে সাধারণ মানুষের কান পাতা দায়। গত বছরের ডিসেম্বরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চারপাশসহ সচিবালয়, আগারগাঁও, সংসদ ভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এলাকাকে নীরব অঞ্চল ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনকেও একই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তবে বাস্তবে এই ঘোষণা কেবলই দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

গবেষণার তথ্য বলছে, এই নীরব এলাকাগুলোতে শব্দের মাত্রা সহনীয় সীমার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ক্যাপস-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সচিবালয় ও সংসদ ভবন এলাকায় শব্দের গড় মাত্রা প্রায় ৯৭ থেকে ১০০ ডেসিবেল, যেখানে দিনের বেলা গ্রহণযোগ্য মাত্রা সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবেল হওয়ার কথা। এমনকি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশের মুখেও শব্দদূষণ হ্রাসের পরিবর্তে উল্টো বেড়েছে। গত ২০২৩ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ঢাকার কোনো আবাসিক বা নীরব এলাকাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না। ফলে প্রায় ৯ লাখ নগরবাসী ৭০ ডেসিবেলের বেশি শব্দের মধ্যে বসবাস করে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন করেছে। এতে নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহারের দায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড এবং অবৈধ হর্ন উৎপাদনের জন্য দুই বছরের কারাদণ্ডের মতো কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি ট্রাফিক সার্জেন্টদের ঘটনাস্থলেই জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে কেবল আইনের প্রয়োগ করে এই নৈরাজ্য থামানো যাচ্ছে না। চালকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং যত্রতত্র হর্ন বাজানোর মানসিকতা এই দূষণকে আরও উসকে দিচ্ছে। তীব্র এই শব্দের কারণে শিশুদের বিকাশে যেমন বাধার সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি বড়দের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ ও অনিদ্রার মতো দীর্ঘমেয়াদী রোগ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অসম্ভব। ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশ বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে শব্দ সৃষ্টিকারী যানবাহন শনাক্ত করার পরিকল্পনা করছে। দিনভর শব্দের মাঝে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক ট্রাফিক পুলিশ সদস্যও শ্রবণশক্তি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। এই জটিল সংকটের সমাধান খুঁজতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দেশব্যাপী সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চালকদের ধৈর্যশীল হওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ


পরিবেশ কন্ঠ

সম্পাদক: ড. মোহাম্মদ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মীযানুর রহমান

কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ