পরিবেশ কন্ঠ

কার গুলিতে ঝরল প্রাণ, সেই উত্তর হাতড়াচ্ছেন শহীদ মায়েরা


প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

কার গুলিতে ঝরল প্রাণ, সেই উত্তর হাতড়াচ্ছেন শহীদ মায়েরা
ফাইল ছবি

তদন্ত প্রতিবেদনে বড় নামের উপস্থিতি থাকলেও অধরা থেকে যাচ্ছে প্রত্যক্ষ খুনিরা; বিচারহীনতার শঙ্কায় স্বজনরা।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত সেই দিনগুলোর পর পেরিয়ে গেছে দুটি বছর। রাজপথের স্লোগান থেমেছে, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, কিন্তু থামেনি একদল মায়ের চোখের জল। রাজধানীর সেন্ট্রাল রোড থেকে মিরপুর, কিংবা ফার্মগেট—সবখানে বাতাসের সাথে মিশে আছে স্বজন হারানোর হাহাকার। শহীদ মায়েরা আজও একটিই প্রশ্ন করে ফিরছেন—'আমার সন্তানকে ঠিক কে গুলি করেছিল?'


২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ধানমন্ডি এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়। ঘটনার দুই বছর পরও তার মা সামসি আরা জামান ছেলের খুনিকে শনাক্ত করার দাবি জানাচ্ছেন। প্রত্যক্ষদর্শী তানভীর আরাফাত ধ্রুবর ভাষ্যমতে, পুলিশ প্রিয়কে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তুলে নিয়ে গিয়েছিল। অথচ বর্তমান তদন্ত প্রতিবেদনে হুকুমদাতাদের নাম থাকলেও সুনির্দিষ্টভাবে কার গুলিতে প্রিয়র মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো অস্পষ্ট। প্রিয়র মা বর্তমানে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নিজের সন্তানের হত্যার বিচার নিয়ে তার প্রতীক্ষার অবসান হয়নি।


একই চিত্র দেখা যায় মিরপুরের শহীদ রাকিবুল হোসেনের পরিবারে। পিবিআই ইতোমধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিলেও রাকিবুলের বাবা আবু বকর সিদ্দিকের আক্ষেপ অন্য জায়গায়। তিনি জানান, তার স্ত্রী প্রায়ই জানতে চান কার গুলিতে ছেলে মারা গেল, কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেন না। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, প্রবল গোলাগুলির মধ্যে কার ছোড়া বুলেটে রাকিবুলের প্রাণ গেছে, তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।

ফার্মগেটে রিকশার পাদানিতে ঝুলে থাকা গোলাম নাফিজের সেই নিথর দেহের ছবি সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। নাফিজের পরিবার এখনো ক্ষোভের সাথে বলছে, যে পুলিশ বাহিনী তখন গুলি চালিয়েছিল, তাদের মাধ্যমেই তদন্ত হওয়াটা কতটা নিরপেক্ষ হবে? নাফিজের বড় ভাই রাসেলের মতে, সরাসরি খুনিকে শনাক্ত না করে দেওয়া চার্জশিট অপূর্ণাঙ্গ।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ৮৬২টি মামলার মধ্যে ৭৯৯টিই হত্যা মামলা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের অভাব এবং একই ঘটনায় একাধিক মামলা তদন্ত প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মনে করেন, শুধুমাত্র নির্দেশদাতাদের বিচার করলেই ন্যায়বিচার পূর্ণ হবে না; যারা সরাসরি গুলি চালিয়েছে তাদেরও শনাক্ত করা জরুরি। অন্যথায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

শহীদ পরিবারগুলোর দাবি একটাই—বিচার যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকৃত অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোই হবে এই অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান।

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ

আপনার মতামত লিখুন

পরিবেশ কন্ঠ

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬


কার গুলিতে ঝরল প্রাণ, সেই উত্তর হাতড়াচ্ছেন শহীদ মায়েরা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

তদন্ত প্রতিবেদনে বড় নামের উপস্থিতি থাকলেও অধরা থেকে যাচ্ছে প্রত্যক্ষ খুনিরা; বিচারহীনতার শঙ্কায় স্বজনরা।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত সেই দিনগুলোর পর পেরিয়ে গেছে দুটি বছর। রাজপথের স্লোগান থেমেছে, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, কিন্তু থামেনি একদল মায়ের চোখের জল। রাজধানীর সেন্ট্রাল রোড থেকে মিরপুর, কিংবা ফার্মগেট—সবখানে বাতাসের সাথে মিশে আছে স্বজন হারানোর হাহাকার। শহীদ মায়েরা আজও একটিই প্রশ্ন করে ফিরছেন—'আমার সন্তানকে ঠিক কে গুলি করেছিল?'


২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ধানমন্ডি এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়। ঘটনার দুই বছর পরও তার মা সামসি আরা জামান ছেলের খুনিকে শনাক্ত করার দাবি জানাচ্ছেন। প্রত্যক্ষদর্শী তানভীর আরাফাত ধ্রুবর ভাষ্যমতে, পুলিশ প্রিয়কে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তুলে নিয়ে গিয়েছিল। অথচ বর্তমান তদন্ত প্রতিবেদনে হুকুমদাতাদের নাম থাকলেও সুনির্দিষ্টভাবে কার গুলিতে প্রিয়র মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো অস্পষ্ট। প্রিয়র মা বর্তমানে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নিজের সন্তানের হত্যার বিচার নিয়ে তার প্রতীক্ষার অবসান হয়নি।


একই চিত্র দেখা যায় মিরপুরের শহীদ রাকিবুল হোসেনের পরিবারে। পিবিআই ইতোমধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিলেও রাকিবুলের বাবা আবু বকর সিদ্দিকের আক্ষেপ অন্য জায়গায়। তিনি জানান, তার স্ত্রী প্রায়ই জানতে চান কার গুলিতে ছেলে মারা গেল, কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেন না। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, প্রবল গোলাগুলির মধ্যে কার ছোড়া বুলেটে রাকিবুলের প্রাণ গেছে, তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।

ফার্মগেটে রিকশার পাদানিতে ঝুলে থাকা গোলাম নাফিজের সেই নিথর দেহের ছবি সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। নাফিজের পরিবার এখনো ক্ষোভের সাথে বলছে, যে পুলিশ বাহিনী তখন গুলি চালিয়েছিল, তাদের মাধ্যমেই তদন্ত হওয়াটা কতটা নিরপেক্ষ হবে? নাফিজের বড় ভাই রাসেলের মতে, সরাসরি খুনিকে শনাক্ত না করে দেওয়া চার্জশিট অপূর্ণাঙ্গ।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ৮৬২টি মামলার মধ্যে ৭৯৯টিই হত্যা মামলা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের অভাব এবং একই ঘটনায় একাধিক মামলা তদন্ত প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মনে করেন, শুধুমাত্র নির্দেশদাতাদের বিচার করলেই ন্যায়বিচার পূর্ণ হবে না; যারা সরাসরি গুলি চালিয়েছে তাদেরও শনাক্ত করা জরুরি। অন্যথায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

শহীদ পরিবারগুলোর দাবি একটাই—বিচার যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকৃত অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোই হবে এই অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান।

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ


পরিবেশ কন্ঠ

সম্পাদক: ড. মোহাম্মদ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মীযানুর রহমান

কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ