পরিবেশ কন্ঠ

সিন্ডিকেট ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট: ড. সালেহউদ্দিন


প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

সিন্ডিকেট ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট: ড. সালেহউদ্দিন
সংগৃহীত

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ

অর্থনীতির একটি চমৎকার তত্ত্ব হলো ‘ভোক্তার উদ্বৃত্ত’। যখন একজন মানুষ বাজারে গিয়ে কোনো পণ্য তার প্রত্যাশার চেয়ে কম দামে কিনতে পারেন, তখন তিনি যে মানসিক তৃপ্তি পান, সেটিই তাকে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে ভোক্তারা প্রতিনিয়ত ‘ভোক্তা ঘাটতি’ বা ডেফিসিটের শিকার হচ্ছেন। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে শক্তিশালী বাজার সিন্ডিকেট, যারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভোক্তারা অনেক ক্ষেত্রে সচেতন নন এবং তাদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও সীমিত। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী বাজারকে জিম্মি করে রেখেছে। এই সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালিত। ফলে তৃণমূলের উৎপাদকরা যেমন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, তেমনি সাধারণ ক্রেতাদেরও পকেট কাটছে এই মধ্যস্বত্বভোগীরা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই আগুনে ঘি ঢালছে সিন্ডিকেটের অদৃশ্য হাত, যা সরাসরি ভোক্তার জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

শুধু বাজার ব্যবস্থাপনা নয়, আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারণী কিছু ভুল সিদ্ধান্তও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পলিসি রেট বাড়াচ্ছিল, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে বেঁধে রেখেছিল। এর ফলে একশ্রেণির প্রভাবশালী উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করেছেন, এমনকি অনেকে অর্থ পাচারও করেছেন। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকায় দীর্ঘ সময় আটকে রাখায় হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসার প্রবণতা বেড়েছিল, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে দুর্বল করে দিয়েছে।

বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করার পর তা ১৫-১৬ শতাংশে পৌঁছালেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০২৬ সালের জুন কোয়ার্টারে জিডিপি ও বেসরকারি বিনিয়োগের অনুপাত দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। বরং অর্থনীতির প্রতিটি রন্ধ্রে থাকা সিন্ডিকেট এবং অপচক্রের দৌরাত্ম্য প্রতিহত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষের আয়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সমন্বয় না হলে এই ‘ভোক্তা ঘাটতি’ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অসম্ভব।

লেখক : সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ

আপনার মতামত লিখুন

পরিবেশ কন্ঠ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


সিন্ডিকেট ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট: ড. সালেহউদ্দিন

প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ

অর্থনীতির একটি চমৎকার তত্ত্ব হলো ‘ভোক্তার উদ্বৃত্ত’। যখন একজন মানুষ বাজারে গিয়ে কোনো পণ্য তার প্রত্যাশার চেয়ে কম দামে কিনতে পারেন, তখন তিনি যে মানসিক তৃপ্তি পান, সেটিই তাকে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে ভোক্তারা প্রতিনিয়ত ‘ভোক্তা ঘাটতি’ বা ডেফিসিটের শিকার হচ্ছেন। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে শক্তিশালী বাজার সিন্ডিকেট, যারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভোক্তারা অনেক ক্ষেত্রে সচেতন নন এবং তাদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও সীমিত। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী বাজারকে জিম্মি করে রেখেছে। এই সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লালিত। ফলে তৃণমূলের উৎপাদকরা যেমন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, তেমনি সাধারণ ক্রেতাদেরও পকেট কাটছে এই মধ্যস্বত্বভোগীরা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই আগুনে ঘি ঢালছে সিন্ডিকেটের অদৃশ্য হাত, যা সরাসরি ভোক্তার জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

শুধু বাজার ব্যবস্থাপনা নয়, আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারণী কিছু ভুল সিদ্ধান্তও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পলিসি রেট বাড়াচ্ছিল, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে বেঁধে রেখেছিল। এর ফলে একশ্রেণির প্রভাবশালী উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করেছেন, এমনকি অনেকে অর্থ পাচারও করেছেন। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকায় দীর্ঘ সময় আটকে রাখায় হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসার প্রবণতা বেড়েছিল, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে দুর্বল করে দিয়েছে।

বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করার পর তা ১৫-১৬ শতাংশে পৌঁছালেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০২৬ সালের জুন কোয়ার্টারে জিডিপি ও বেসরকারি বিনিয়োগের অনুপাত দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। বরং অর্থনীতির প্রতিটি রন্ধ্রে থাকা সিন্ডিকেট এবং অপচক্রের দৌরাত্ম্য প্রতিহত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষের আয়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সমন্বয় না হলে এই ‘ভোক্তা ঘাটতি’ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অসম্ভব।

লেখক : সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ


পরিবেশ কন্ঠ

সম্পাদক: ড. মোহাম্মদ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মীযানুর রহমান

কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ