পরিবেশ কন্ঠ

ঈদযাত্রায় স্বস্তি কোথায়?

পবিত্র ঈদুল আযহা ঘিরে শুরু হয়েছে নাড়ির টানে ঘরে ফেরার মহাযাত্রা। বছরের পর বছর কর্মব্যস্ত শহুরে জীবনে ক্লান্ত মানুষগুলো এখন ছুটছেন গ্রামের পথে—প্রিয় বাবা-মা, সন্তান, স্বজন কিংবা শৈশবের পরিচিত উঠোনে ফিরে যাওয়ার আনন্দ নিয়ে। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট কিংবা মহাসড়ক—সবখানেই এখন মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কারও চোখে আনন্দ, কারও মুখে অপেক্ষার ক্লান্তি, আবার কারও মনে নিরাপদে পৌঁছানোর নীরব দুশ্চিন্তা।ঈদযাত্রা শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়; এটি বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা আর পারিবারিক বন্ধনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রতিবছরের মতো এবারও সেই আনন্দযাত্রা নানা ভোগান্তি, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতায় ম্লান হয়ে পড়ছে।মহাসড়কজুড়ে বাড়তি যানবাহনের চাপ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দীর্ঘ যানজট, ধীরগতির যান চলাচল এবং কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার ঘটনায় দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ যাত্রীরা। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের কষ্ট যেন আরও বেশি। অতিরিক্ত গরম, ক্লান্তি এবং দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকার কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন পথেই।এদিকে পরিবহন খাতে অনিয়মও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পুরোনো হলেও প্রতি ঈদেই তা নতুন করে যাত্রীদের ক্ষোভ বাড়ায়। সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা গুনে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনে যাতায়াত করছেন। কোথাও সিটের চেয়ে বেশি যাত্রী বহন, কোথাও আবার ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়েই চলছে দীর্ঘপথের যাত্রা। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণে।ঈদযাত্রার আরেকটি বড় উদ্বেগের নাম নিরাপত্তাহীনতা। ঘরমুখো মানুষের ভিড়কে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে ওঠে বিভিন্ন অপরাধচক্র। পকেটমার, ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টি কিংবা তথাকথিত ‘মলম পার্টি’র তৎপরতায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যাত্রীরা। বাসস্ট্যান্ড, ফেরিঘাট কিংবা ট্রেনস্টেশনে অসচেতন মুহূর্তেই কেউ হারাচ্ছেন টাকা, কেউ মূল্যবান মালামাল। বিশেষ করে গভীর রাতে চলাচলকারী যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।শুধু অপরাধ নয়, সড়ক দুর্ঘটনার শঙ্কাও প্রতি ঈদেই নতুন করে সামনে আসে। অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং এবং ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে প্রতিবছর অসংখ্য প্রাণ ঝরে যায়। একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই একটি পরিবারের ঈদের আনন্দকে শোকে পরিণত করে। কেউ হারান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে, কেউ হারান প্রিয় সন্তানকে, আবার কেউ হয়তো সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন। অথচ একটু সচেতনতা, নিয়ম মেনে গাড়ি চালানো এবং কঠোর তদারকি থাকলে এসব দুর্ঘটনার অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদযাত্রার ভোগান্তির পেছনে অন্যতম কারণ দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলার অভাব। মহাসড়কের পাশে অবৈধ দখল, যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নকাজ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আধুনিক সড়ক নির্মাণ করলেই হবে না, সেই সড়কে নিয়ম ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।যদিও সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও যানজট নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা। শুধু ঘোষণা নয়, কার্যকর পদক্ষেপই পারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। মহাসড়কে কঠোর নজরদারি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, নির্ধারিত ভাড়ার বাস্তবায়ন এবং অপরাধচক্র দমনে সমন্বিত অভিযান এখন সময়ের দাবি।সচেতনতার বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চালক, যাত্রী এবং পথচারী—সবার দায়িত্বশীল আচরণই একটি নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে পারে। অযথা ঝুঁকি না নেওয়া, চলন্ত গাড়িতে ওঠানামা না করা, অপরিচিত কারও দেওয়া খাবার গ্রহণ না করা কিংবা ট্রাফিক আইন মেনে চলার মতো ছোট ছোট বিষয়গুলো বড় দুর্ঘটনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সহায়তা করতে পারে।ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন যাত্রাপথ হয় নির্বিঘ্ন, নিরাপদ এবং স্বস্তিদায়ক। মানুষ চায় না ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে, চায় না পরিবারের কাছে ফেরার পথে আতঙ্কে কাটাতে। তারা শুধু চায় নিশ্চিন্তে প্রিয়জনের কাছে পৌঁছাতে, ভালোবাসার মানুষগুলোর সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে।এই ঈদুল আযহা-য় দেশের মানুষের একটাই প্রত্যাশা—পথ হোক নিরাপদ, সড়কে ফিরুক শৃঙ্খলা, আর প্রতিটি ঘরমুখো মানুষ পৌঁছে যাক তার আপন ঠিকানায় নিরাপদে ও স্বস্তিতে।লেখক : মীযানুর রহমানমহাসচিব, পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি

ঈদযাত্রায় স্বস্তি কোথায়?