দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার বন্ধ; অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ও সমন্বিত জনবলের অভাবে ধুঁকছে গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা।
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো এখন অস্ত্রোপচারহীন এক সংকটে নিমজ্জিত। আধুনিক অপারেশন থিয়েটার ও কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জনবল ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এসব চিকিৎসাকেন্দ্র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪৩৩টি উপজেলার মধ্যে ৩৪৪টিতেই অস্ত্রোপচার সেবা বন্ধ রয়েছে, যা মোট সংখ্যায় প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে সাধারণ রোগীরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি উভয়ই বাড়িয়ে তুলছে।
অস্ত্রোপচার বন্ধ হওয়ার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞের তীব্র সংকট। ৪৩৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিপরীতে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট আছেন মাত্র ১৪২ জন, যার অর্থ প্রায় ৭০ শতাংশ পদই শূন্য। একজন সার্জনের বিপরীতে অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের সংখ্যা মাত্র ০.৩৭ জন। এই ভারসাম্যহীনতার কারণে সার্জন ও গাইনি বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও অনেক হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, ল্যাব টেকনিশিয়ানের অভাব এবং কারিগরি জনবলের সংকটে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রামের মতো মৌলিক সেবাগুলোও মুখ থুবড়ে পড়েছে।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র আরও ভয়াবহ। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু হোক কিংবা দিনাজপুরের বিরামপুর—সবখানেই চিত্র প্রায় একই। কোথাও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ নেই, আবার কোথাও চিকিৎসক থাকলেও তারা সংযুক্তিতে বড় শহরের হাসপাতালগুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন। মেহেরপুরের চিত্র তো আরও শোচনীয়; সেখানে একজন মাত্র অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের বদলির কারণে পুরো জেলার সরকারি অস্ত্রোপচার সেবা দেড় মাস ধরে বন্ধ। এই অব্যবস্থাপনার ফলে শুধু অপারেশন থিয়েটারেই তালা ঝুলছে না, বরং পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্রের কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই অবস্থাকে ‘ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’র লক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ড. আবু জামিল ফয়সালের মতে, শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতার চেয়ে বিদ্যমান অপারেশন থিয়েটারগুলো সচল করা বেশি জরুরি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ওষুধ এবং সহায়ক জনবলের একটি সমন্বিত পদ্ধতি নিশ্চিত না করলে এই সংকট দূর হওয়া সম্ভব নয়। প্রান্তিক মানুষের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল এই হাসপাতালগুলোকে বাঁচাতে হলে দ্রুত শূন্য পদ পূরণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসার দরজাগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরি-কন্ঠ/মুয়াজ
(সূত্র: দৈনিক কালের কন্ঠ)

শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার বন্ধ; অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ও সমন্বিত জনবলের অভাবে ধুঁকছে গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা।
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো এখন অস্ত্রোপচারহীন এক সংকটে নিমজ্জিত। আধুনিক অপারেশন থিয়েটার ও কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জনবল ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এসব চিকিৎসাকেন্দ্র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪৩৩টি উপজেলার মধ্যে ৩৪৪টিতেই অস্ত্রোপচার সেবা বন্ধ রয়েছে, যা মোট সংখ্যায় প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে সাধারণ রোগীরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি উভয়ই বাড়িয়ে তুলছে।
অস্ত্রোপচার বন্ধ হওয়ার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞের তীব্র সংকট। ৪৩৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিপরীতে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট আছেন মাত্র ১৪২ জন, যার অর্থ প্রায় ৭০ শতাংশ পদই শূন্য। একজন সার্জনের বিপরীতে অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের সংখ্যা মাত্র ০.৩৭ জন। এই ভারসাম্যহীনতার কারণে সার্জন ও গাইনি বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও অনেক হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, ল্যাব টেকনিশিয়ানের অভাব এবং কারিগরি জনবলের সংকটে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রামের মতো মৌলিক সেবাগুলোও মুখ থুবড়ে পড়েছে।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র আরও ভয়াবহ। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু হোক কিংবা দিনাজপুরের বিরামপুর—সবখানেই চিত্র প্রায় একই। কোথাও অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ নেই, আবার কোথাও চিকিৎসক থাকলেও তারা সংযুক্তিতে বড় শহরের হাসপাতালগুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন। মেহেরপুরের চিত্র তো আরও শোচনীয়; সেখানে একজন মাত্র অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের বদলির কারণে পুরো জেলার সরকারি অস্ত্রোপচার সেবা দেড় মাস ধরে বন্ধ। এই অব্যবস্থাপনার ফলে শুধু অপারেশন থিয়েটারেই তালা ঝুলছে না, বরং পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্রের কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই অবস্থাকে ‘ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’র লক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ড. আবু জামিল ফয়সালের মতে, শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতার চেয়ে বিদ্যমান অপারেশন থিয়েটারগুলো সচল করা বেশি জরুরি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ওষুধ এবং সহায়ক জনবলের একটি সমন্বিত পদ্ধতি নিশ্চিত না করলে এই সংকট দূর হওয়া সম্ভব নয়। প্রান্তিক মানুষের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল এই হাসপাতালগুলোকে বাঁচাতে হলে দ্রুত শূন্য পদ পূরণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসার দরজাগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরি-কন্ঠ/মুয়াজ
(সূত্র: দৈনিক কালের কন্ঠ)

আপনার মতামত লিখুন