পরিবেশ কন্ঠ

সোনারগাঁয়ের সুলতানি স্থাপত্যের নীরব সাক্ষী

গোয়ালদি মসজিদ:



গোয়ালদি মসজিদ:
ছবি: গোয়ালদি মসজিদ

সোনারগাঁয়ের গোয়ালদি মসজিদ মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। গোয়ালদি শাহী মসজিদ নামে পরিচিত এই স্থাপনাটি ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড হয়ে মোগরাপাড়া থেকে উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। মসজিদের শিলালিপি অনুযায়ী, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর শাসনামলে (১৪৯৪–১৫১৯) ৯২৫ হিজরির ১৫ শাবান মোতাবেক ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে মোল্লা হিজাবর আকবর খান এটি নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য, হোসেন শাহর আমলে বাংলার শিক্ষা, শিল্প ও সাহিত্য উৎকর্ষ লাভ করেছিল।

মসজিদটি এক গম্বুজবিশিষ্ট ও বর্গাকার। এর পরিমাপ ২৬'-২" × ২৬'-২" এবং দেওয়ালের পুরুত্ব ৫ ফুট। মসজিদে কোনো স্তম্ভ, বারান্দা বা উন্মুক্ত অঙ্গন নেই। চারকোণায় উদ্গত অবস্থায় চারটি গোলাকার বুরুজ দেখা যায়। পূর্ব দেওয়ালে সুলতানি রীতিতে খিলানবিশিষ্ট তিনটি দরজা এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি করে দুটি খিলানবিশিষ্ট দরজা রয়েছে। অভ্যন্তরে তিনটি মিহরাব লক্ষ করা যায়—প্রধান মিহরাবটি বেলেপাথরে নির্মিত ও লতাপাতা নকশায় ভরপুর, আর দুপাশের দুটি ইটের মধ্যে কাটা নকশায় সৌন্দর্যমণ্ডিত। মসজিদের ভেতর ও বাইরের দেওয়ালে পাথর এবং ইটের ওপর আরব্য অলংকরণ লক্ষণীয়। টেরাকোটা নকশায় ব্যবহৃত মোটিফগুলোর সাদৃশ্য সোনারগাঁয়ের সুলতান গিয়াস উদ্দিন শাহর প্রস্তরনির্মিত সমাধির সঙ্গে পাওয়া যায়। মসজিদের বাইরে পানি নিস্কাশনের জন্য নালা ছিল।

গোয়ালদি মসজিদ বাংলার 'ঘেরা বর্গাকার' মসজিদের একটি ভালো উদাহরণ, যা কিবলা প্রাচীর ব্যতীত চারদিকে কোণার টাওয়ার এবং প্রবেশদ্বার সহ একটি ঘনক প্রার্থনা কক্ষ দ্বারা আলাদা। একটি একক গম্বুজ মসজিদ ক্যাপ; জড়িত চার কোণ সংজ্ঞায়িত; এবং কার্নিস আলতোভাবে ঢালু হয়। বৃত্তাকার কোণার টাওয়ারগুলি সাধারণ অষ্টভুজাকার কোণার টাওয়ার থেকে একটি বিচ্যুতি থাকে। পূর্ব সম্মুখভাগে তিনটি খিলান খোলা রয়েছে, যার উভয় পাশে একটি আলংকারিক ঝুলন্ত বাতি মোটিফসহ একটি কুলুঙ্গির আকারে সূক্ষ্ম কাজের আয়তক্ষেত্রাকার প্যানেল দ্বারা অলঙ্কৃত। উত্তর ও দক্ষিণের সম্মুখভাগ একইভাবে তিনটি খিলান প্রদর্শন করে, যদিও শুধুমাত্র কেন্দ্রের খিলান খোলা থাকে এবং দুই পাশের খিলান অন্ধ। গম্বুজটি স্কুইঞ্চের উপর বাহিত হয় যা পাথরের পিলাস্টারের শীর্ষ থেকে উঠে আসে, প্রতিটি দেয়ালে দুটি। কিবলার দেয়ালে তিনটি মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবের জন্য কালো ব্যাসল্ট ব্যবহার ষোড়শ শতাব্দীতে একটি সাধারণ অভ্যাস ছিল। এটি একটি শোভাময় ঝুলন্ত ল্যাম্প মোটিফের সমন্বয়ে গঠিত সুন্দর, জটিল নিদর্শন দিয়ে সজ্জিত। দুটি পার্শ্ববর্তী মিহরাব একই ধাঁচে সজ্জিত কিন্তু কালো বেসাল্টের পরিবর্তে ইট ও সূক্ষ্ম টেরাকোটা দিয়ে তৈরি। পদ্মের মোটিফগুলি স্প্যান্ড্রেলগুলিতে খোদাই করা পাওয়া যায়।

বরেণ্য লেখক ও চিকিৎসাবিদ ড. জেমস ওয়াইজ (১৮৩৫–১৮৮৬) মসজিদটি পরিদর্শন করে লক্ষ্য করেন, এটি দ্রুত ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে—গম্বুজের উপর পিপল গাছ বেড়ে উঠে ফাটল ধরেছে এবং লতাগুলো বাইরের দেওয়াল আঁকড়ে ধরে ধ্বংসে সহায়তা করছে। তিনি মসজিদের অভ্যন্তরীণ আয়তন ১৬৪ ফুট বর্গাকার বলে উল্লেখ করেন।


স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম মসজিদের একটি শিলালিপি শনাক্ত করেন, যা পরবর্তীতে হেনরি ফার্ডিন্যান্ড ব্লকম্যান আরবি থেকে পাঠোদ্ধার করে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে অনুবাদসহ সম্পাদনা করেন। কানিংহাম বাইরের আয়তন ৭.৯২ × ৭.৯২ মিটার এবং দেওয়ালের প্রশস্ততা প্রায় ১.৬১ মিটার বলে উল্লেখ করেন। তিনি মসজিদের ইটের গাঁথুনি ও টেরাকোটা অলংকরণের গুণমানকে বাঙালি কারিগরদের স্বকীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করেন এবং মনে করেন, গৌড় ও পাণ্ডুয়ার স্থাপত্যশৈলী আকারে বড় হওয়ার পাশাপাশি অলংকরণেও অত্যন্ত পরিশীলিত ছিল।

ডক্টর এ. এইচ. দানী (১৯২০–২০০৯) মিহরাবের অবস্থান ও সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখান, প্রাথমিক যুগের মসজিদে সাধারণত একটি কেন্দ্রীয় মিহরাব থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবে একাধিক মিহরাবের প্রচলন ঘটে। তিনি মসজিদের অভ্যন্তরীণ স্থাপত্যকে কেবল কারিগরি নকশা হিসেবে নয়, বরং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতীকের ভাণ্ডার হিসেবে চিহ্নিত করেন।

শামসুদ্দিন আহমেদ লক্ষ্য করেন, সুলতানি আমলে বাংলায় যে মসজিদ স্থাপত্যের বিকাশ ঘটে, তার সঙ্গে এই মসজিদের নকশার সাদৃশ্য স্পষ্ট—বিশেষত ইলিয়াস শাহি ও হুসেন শাহি সুলতানদের নির্মাণশৈলীর প্রভাব এখানে বিদ্যমান।

স্বরূপ চন্দ্র রায় তাঁর 'সুবর্ণগ্রামের ইতিহাস' (১৮৯১) গ্রন্থে উল্লেখ করেন, গোয়ালদি মসজিদ সোনারগাঁয়ের প্রাচীনতম মসজিদ। তাঁর বিবরণ থেকে জানা যায়, ঊনবিংশ শতকের শেষভাগেও মসজিদটি স্থাপত্যের দিক থেকে অনন্য ছিল, তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জৌলুস কমে গিয়েছিল। তিনি আরও জানান, ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত আবদুল হামিদের মসজিদই তখন প্রধান নামাজের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং হোসেন শাহের মসজিদটি কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল।

১৯৬৩ সালে এই প্রত্নস্থলটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সংস্কারের পূর্বে মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব দিক, গম্বুজ ও দেওয়াল ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল। ১৯৭৫–৭৬ সালে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদটি সংস্কার করা হয়। তবুও আজও এটি অপেক্ষাকৃত উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।

মসজিদের ইতিহাস সম্বলিত একটি সাইনবোর্ডে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর লিখেছে মুঘল আমলে ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের আগে সোনারগাঁয় বারো ভুইয়া প্রধান ঈশা খাঁ, মুসা খাঁ ও এর আগের স্বাধীন সুলতানদের রাজধানী ছিল। রাজধানী ও রাজসভার জন্য মনোরম ইমারত ছাড়াও মুসলিম শাসকেরা এখানে মসজিদ, খাঁনকা ও সমাধি নির্মাণ করেন। তার মধ্যে এ মসজিদটি অন্যতম।

গোয়ালদি মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়—এটি বাংলার সুলতানি স্থাপত্যের স্বর্ণযুগের, টেরাকোটা শিল্পের সমৃদ্ধির এবং হোসেন শাহি পৃষ্ঠপোষকতার এক জীবন্ত দলিল। জেমস ওয়াইজ, আলেকজান্ডার কানিংহাম, এ. এইচ. দানী ও স্বরূপ চন্দ্র রায়ের বিবরণী মিলিয়ে এই মসজিদের স্থাপত্যগত বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য সুস্পষ্ট। কিন্তু সংরক্ষণের অপর্যাপ্ততা ও কালের বিবর্তনে এই মূল্যবান নিদর্শনটি আজ সংকটাপন্ন—যা বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার প্রতি জোরালো ইঙ্গিত বহন করে।

আপনার মতামত লিখুন

পরিবেশ কন্ঠ

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬


গোয়ালদি মসজিদ:

প্রকাশের তারিখ : ০২ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সোনারগাঁয়ের গোয়ালদি মসজিদ মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। গোয়ালদি শাহী মসজিদ নামে পরিচিত এই স্থাপনাটি ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড হয়ে মোগরাপাড়া থেকে উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। মসজিদের শিলালিপি অনুযায়ী, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর শাসনামলে (১৪৯৪–১৫১৯) ৯২৫ হিজরির ১৫ শাবান মোতাবেক ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে মোল্লা হিজাবর আকবর খান এটি নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য, হোসেন শাহর আমলে বাংলার শিক্ষা, শিল্প ও সাহিত্য উৎকর্ষ লাভ করেছিল।

মসজিদটি এক গম্বুজবিশিষ্ট ও বর্গাকার। এর পরিমাপ ২৬'-২" × ২৬'-২" এবং দেওয়ালের পুরুত্ব ৫ ফুট। মসজিদে কোনো স্তম্ভ, বারান্দা বা উন্মুক্ত অঙ্গন নেই। চারকোণায় উদ্গত অবস্থায় চারটি গোলাকার বুরুজ দেখা যায়। পূর্ব দেওয়ালে সুলতানি রীতিতে খিলানবিশিষ্ট তিনটি দরজা এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি করে দুটি খিলানবিশিষ্ট দরজা রয়েছে। অভ্যন্তরে তিনটি মিহরাব লক্ষ করা যায়—প্রধান মিহরাবটি বেলেপাথরে নির্মিত ও লতাপাতা নকশায় ভরপুর, আর দুপাশের দুটি ইটের মধ্যে কাটা নকশায় সৌন্দর্যমণ্ডিত। মসজিদের ভেতর ও বাইরের দেওয়ালে পাথর এবং ইটের ওপর আরব্য অলংকরণ লক্ষণীয়। টেরাকোটা নকশায় ব্যবহৃত মোটিফগুলোর সাদৃশ্য সোনারগাঁয়ের সুলতান গিয়াস উদ্দিন শাহর প্রস্তরনির্মিত সমাধির সঙ্গে পাওয়া যায়। মসজিদের বাইরে পানি নিস্কাশনের জন্য নালা ছিল।

গোয়ালদি মসজিদ বাংলার 'ঘেরা বর্গাকার' মসজিদের একটি ভালো উদাহরণ, যা কিবলা প্রাচীর ব্যতীত চারদিকে কোণার টাওয়ার এবং প্রবেশদ্বার সহ একটি ঘনক প্রার্থনা কক্ষ দ্বারা আলাদা। একটি একক গম্বুজ মসজিদ ক্যাপ; জড়িত চার কোণ সংজ্ঞায়িত; এবং কার্নিস আলতোভাবে ঢালু হয়। বৃত্তাকার কোণার টাওয়ারগুলি সাধারণ অষ্টভুজাকার কোণার টাওয়ার থেকে একটি বিচ্যুতি থাকে। পূর্ব সম্মুখভাগে তিনটি খিলান খোলা রয়েছে, যার উভয় পাশে একটি আলংকারিক ঝুলন্ত বাতি মোটিফসহ একটি কুলুঙ্গির আকারে সূক্ষ্ম কাজের আয়তক্ষেত্রাকার প্যানেল দ্বারা অলঙ্কৃত। উত্তর ও দক্ষিণের সম্মুখভাগ একইভাবে তিনটি খিলান প্রদর্শন করে, যদিও শুধুমাত্র কেন্দ্রের খিলান খোলা থাকে এবং দুই পাশের খিলান অন্ধ। গম্বুজটি স্কুইঞ্চের উপর বাহিত হয় যা পাথরের পিলাস্টারের শীর্ষ থেকে উঠে আসে, প্রতিটি দেয়ালে দুটি। কিবলার দেয়ালে তিনটি মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবের জন্য কালো ব্যাসল্ট ব্যবহার ষোড়শ শতাব্দীতে একটি সাধারণ অভ্যাস ছিল। এটি একটি শোভাময় ঝুলন্ত ল্যাম্প মোটিফের সমন্বয়ে গঠিত সুন্দর, জটিল নিদর্শন দিয়ে সজ্জিত। দুটি পার্শ্ববর্তী মিহরাব একই ধাঁচে সজ্জিত কিন্তু কালো বেসাল্টের পরিবর্তে ইট ও সূক্ষ্ম টেরাকোটা দিয়ে তৈরি। পদ্মের মোটিফগুলি স্প্যান্ড্রেলগুলিতে খোদাই করা পাওয়া যায়।

বরেণ্য লেখক ও চিকিৎসাবিদ ড. জেমস ওয়াইজ (১৮৩৫–১৮৮৬) মসজিদটি পরিদর্শন করে লক্ষ্য করেন, এটি দ্রুত ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে—গম্বুজের উপর পিপল গাছ বেড়ে উঠে ফাটল ধরেছে এবং লতাগুলো বাইরের দেওয়াল আঁকড়ে ধরে ধ্বংসে সহায়তা করছে। তিনি মসজিদের অভ্যন্তরীণ আয়তন ১৬৪ ফুট বর্গাকার বলে উল্লেখ করেন।


স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম মসজিদের একটি শিলালিপি শনাক্ত করেন, যা পরবর্তীতে হেনরি ফার্ডিন্যান্ড ব্লকম্যান আরবি থেকে পাঠোদ্ধার করে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে অনুবাদসহ সম্পাদনা করেন। কানিংহাম বাইরের আয়তন ৭.৯২ × ৭.৯২ মিটার এবং দেওয়ালের প্রশস্ততা প্রায় ১.৬১ মিটার বলে উল্লেখ করেন। তিনি মসজিদের ইটের গাঁথুনি ও টেরাকোটা অলংকরণের গুণমানকে বাঙালি কারিগরদের স্বকীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করেন এবং মনে করেন, গৌড় ও পাণ্ডুয়ার স্থাপত্যশৈলী আকারে বড় হওয়ার পাশাপাশি অলংকরণেও অত্যন্ত পরিশীলিত ছিল।

ডক্টর এ. এইচ. দানী (১৯২০–২০০৯) মিহরাবের অবস্থান ও সংখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখান, প্রাথমিক যুগের মসজিদে সাধারণত একটি কেন্দ্রীয় মিহরাব থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবে একাধিক মিহরাবের প্রচলন ঘটে। তিনি মসজিদের অভ্যন্তরীণ স্থাপত্যকে কেবল কারিগরি নকশা হিসেবে নয়, বরং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতীকের ভাণ্ডার হিসেবে চিহ্নিত করেন।

শামসুদ্দিন আহমেদ লক্ষ্য করেন, সুলতানি আমলে বাংলায় যে মসজিদ স্থাপত্যের বিকাশ ঘটে, তার সঙ্গে এই মসজিদের নকশার সাদৃশ্য স্পষ্ট—বিশেষত ইলিয়াস শাহি ও হুসেন শাহি সুলতানদের নির্মাণশৈলীর প্রভাব এখানে বিদ্যমান।

স্বরূপ চন্দ্র রায় তাঁর 'সুবর্ণগ্রামের ইতিহাস' (১৮৯১) গ্রন্থে উল্লেখ করেন, গোয়ালদি মসজিদ সোনারগাঁয়ের প্রাচীনতম মসজিদ। তাঁর বিবরণ থেকে জানা যায়, ঊনবিংশ শতকের শেষভাগেও মসজিদটি স্থাপত্যের দিক থেকে অনন্য ছিল, তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জৌলুস কমে গিয়েছিল। তিনি আরও জানান, ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত আবদুল হামিদের মসজিদই তখন প্রধান নামাজের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং হোসেন শাহের মসজিদটি কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল।

১৯৬৩ সালে এই প্রত্নস্থলটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সংস্কারের পূর্বে মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব দিক, গম্বুজ ও দেওয়াল ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল। ১৯৭৫–৭৬ সালে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদটি সংস্কার করা হয়। তবুও আজও এটি অপেক্ষাকৃত উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।

মসজিদের ইতিহাস সম্বলিত একটি সাইনবোর্ডে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর লিখেছে মুঘল আমলে ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের আগে সোনারগাঁয় বারো ভুইয়া প্রধান ঈশা খাঁ, মুসা খাঁ ও এর আগের স্বাধীন সুলতানদের রাজধানী ছিল। রাজধানী ও রাজসভার জন্য মনোরম ইমারত ছাড়াও মুসলিম শাসকেরা এখানে মসজিদ, খাঁনকা ও সমাধি নির্মাণ করেন। তার মধ্যে এ মসজিদটি অন্যতম।

গোয়ালদি মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়—এটি বাংলার সুলতানি স্থাপত্যের স্বর্ণযুগের, টেরাকোটা শিল্পের সমৃদ্ধির এবং হোসেন শাহি পৃষ্ঠপোষকতার এক জীবন্ত দলিল। জেমস ওয়াইজ, আলেকজান্ডার কানিংহাম, এ. এইচ. দানী ও স্বরূপ চন্দ্র রায়ের বিবরণী মিলিয়ে এই মসজিদের স্থাপত্যগত বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য সুস্পষ্ট। কিন্তু সংরক্ষণের অপর্যাপ্ততা ও কালের বিবর্তনে এই মূল্যবান নিদর্শনটি আজ সংকটাপন্ন—যা বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার প্রতি জোরালো ইঙ্গিত বহন করে।


পরিবেশ কন্ঠ

সম্পাদক: ড. মোহাম্মদ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মীযানুর রহমান

কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ