পরিবেশ কন্ঠ

সড়ক-দখলে বিপন্ন কক্সবাজারের প্রকৃতি, বাপার উদ্বেগ

কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ, মহেশখালীর সংরক্ষিত পাহাড়ি বনের মধ্য দিয়ে সড়ক তৈরির উদ্যোগ এবং সোনাদিয়া দ্বীপের প্যারাবন দখল ও ধ্বংসের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)।সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘অপরিকল্পিত উন্নয়নে বিপন্ন কক্সবাজার: পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরে সংগঠনটি।বাপার সহসভাপতি জাকির হোসেন লিখিত বক্তব্যে বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের কারণে কক্সবাজারের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।সংগঠনটির মতে, কক্সবাজারে পর্যটন, যোগাযোগ ও অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন। তবে এসব উন্নয়ন করতে গিয়ে সৈকত, বালিয়াড়ি, পাহাড়ি বন, প্যারাবন ও জলাভূমির মতো প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করা যাবে না। এসব প্রাকৃতিক ব্যবস্থা উপকূল রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।বাপা জানায়, সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৮ মিটার প্রশস্ত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। জাইকার অর্থায়নে কক্সবাজার পৌরসভার নগর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সড়কটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।বাপার অভিযোগ, সড়ক নির্মাণের জন্য সৈকতের বালিয়াড়িতে ভরাট ও প্রাকৃতিক বালুর স্তরে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে লাল কাঁকড়াসহ বিভিন্ন উপকূলীয় প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। ফলে এ এলাকায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে আইনগত বিধিনিষেধ রয়েছে।বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) করা মামলার পর গত ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট নির্মাণকাজে আট সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা দেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে নির্মিত অংশ অপসারণ এবং সৈকতের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। পরে ১৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখেন।প্রকল্পটির পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাপা। সংগঠনটির দাবি, বিভিন্ন গণমাধ্যমে পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।মহেশখালীর সংরক্ষিত পাহাড়ি বনের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে বাপা।সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর ১২ নম্বর পাহাড় মৌজার ১৮ হাজার ২৮৬ দশমিক ৪০ একর ভূমি ১৯৫৪ সালে ১০০ বছরের জন্য বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৫৭ সালে ওই এলাকাকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জে এম ঘাট থেকে কালারমারছড়া পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের প্রায় ৪৮ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশ সংরক্ষিত বনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্প ব্যয় প্রায় ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বলে বাপার বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।বাপার আশঙ্কা, সংরক্ষিত বনের ভেতর স্থায়ী সড়ক নির্মাণ হলে বন খণ্ডিত হতে পারে। এতে বন্যপ্রাণীর চলাচল ও আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বন দখল, অবৈধ স্থাপনা ও বসতি সম্প্রসারণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।তবে স্থানীয় মানুষের যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেছে বাপা। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন ও জরুরি সেবার জন্য উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা প্রয়োজন হলেও সংরক্ষিত বন ক্ষতিগ্রস্ত না করে বিকল্প পথ বা পরিবেশসম্মত সমাধান খোঁজার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।বাপা জানায়, এ বিষয়ে বেলার করা মামলার পর গত ৬ আগস্ট হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং সড়ক নির্মাণের কার্যক্রমে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দেন। পরে ৮ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ সড়কের প্রস্থ ৫ দশমিক ৫ মিটারের বেশি না করার নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্টের আগের আদেশ স্থগিত করেন।সোনাদিয়া দ্বীপের প্যারাবন ধ্বংস ও দখলের বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। বাপার দাবি, গত কয়েক বছরে দ্বীপটির বড় একটি অংশের প্যারাবন ধ্বংস করে চিংড়িঘেরসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে।সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, একটি প্রতিবেদনে গত চার বছরে প্রায় ৭ হাজার একর প্যারাবন ধ্বংস এবং ৮২টি চিংড়িঘের তৈরির তথ্য এসেছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে প্রায় ১০ হাজার একর ম্যানগ্রোভ বন হারিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।তবে পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য থাকায় প্যারাবন ধ্বংসের প্রকৃত চিত্র জানতে সরকারি পর্যায়ে জিআইএসভিত্তিক জরিপের দাবি জানিয়েছে বাপা।সংগঠনটির মতে, প্যারাবন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রের ঢেউয়ের অভিঘাত কমাতে প্রাকৃতিক বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, পাখি ও বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ-প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবেও এর ভূমিকা রয়েছে।বাপার বক্তব্য, কক্সবাজারের বালিয়াড়ি, পাহাড়ি বন ও প্যারাবনকে কেবল উন্নয়নের জন্য ব্যবহারের উপযোগী জমি হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলোকে প্রাকৃতিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।সংবাদ সম্মেলন থেকে সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে সৈকতের ইসিএ ও নো-ডেভেলপমেন্ট জোনের সীমানা ডিজিটালভাবে প্রকাশের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।মহেশখালীর ক্ষেত্রে সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ চিহ্নিত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করার দাবি জানিয়েছে বাপা।সোনাদিয়ার প্যারাবন রক্ষায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমি পুনরুদ্ধার, স্থানীয় ম্যানগ্রোভ প্রজাতির মাধ্যমে পুনর্বনায়ন এবং নতুন করে বন ধ্বংস বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জেলে, লবণচাষি ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।সংবাদ সম্মেলনে বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, বাপা কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহসহ সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সড়ক-দখলে বিপন্ন কক্সবাজারের প্রকৃতি, বাপার উদ্বেগ