পরিবেশ কন্ঠ

ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও বিবেকহীনতার অন্ধকারে বাংলাদেশ

রামিসার কান্না কি শুধু আরেকটি শিরোনাম হয়েই থাকবে?


প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

রামিসার কান্না কি শুধু আরেকটি শিরোনাম হয়েই থাকবে?
ছবি: পরিবেশ কন্ঠ

একটি ছোট্ট শিশু। নাম তার রামিসা। পৃথিবীটাকে ঠিকমতো চিনে ওঠার আগেই তাকে নির্মমতার শিকার হতে হলো। তার নিষ্পাপ চোখের স্বপ্ন, মায়ের কোল, স্কুলের খাতা—সবকিছু মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল একদল বিবেকহীন মানুষের পাশবিকতায়। রামিসার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের হৃদয় ভেঙে দেয়নি, এটি পুরো বাংলাদেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ভয়ংকর প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই বদলাচ্ছি, নাকি প্রতিটি ঘটনার পর কিছুদিন কান্না করে আবারও সব ভুলে যাচ্ছি?

আজ বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো নারী ও শিশু নিরাপত্তা। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর খবর। কোথাও স্কুলছাত্রী, কোথাও গৃহবধূ, কোথাও আবার মাত্র কয়েক বছরের শিশু। এ যেন এক নীরব সামাজিক মহামারি, যা ধীরে ধীরে আমাদের মানবিকতা গ্রাস করে নিচ্ছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর শত শত নারী ও শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। বাস্তবতা আরও ভয়াবহ, কারণ অসংখ্য ঘটনা সামাজিক লজ্জা, ভয়, হুমকি কিংবা প্রভাবশালীদের চাপের কারণে প্রকাশই পায় না। গ্রামের অনেক পরিবার এখনও “সম্মানের” ভয়ে ধর্ষণের অভিযোগ পর্যন্ত করতে চায় না। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—আমরা ধীরে ধীরে ভয়ংকর এক অসংবেদনশীল সমাজে পরিণত হচ্ছি। একটি ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকদিন তীব্র আলোচনা হয়, মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে, মিছিল হয়, মানববন্ধন হয়, তারপর আবার সব নীরব। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারটির জীবন আর কখনো স্বাভাবিক হয় না। একজন মা তার সন্তানের শূন্য বিছানা দেখে প্রতিদিন ভেঙে পড়েন, একজন বাবা সমাজের সামনে মাথা নিচু করে বেঁচে থাকেন, আর একটি শিশু আজীবনের জন্য মানসিক যন্ত্রণার ভার বহন করে।

আমাদের সমাজে নারীকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে মানুষ হিসেবে নয়, বরং দুর্বল একটি সত্তা হিসেবে দেখা হয়। ধর্ষণের ঘটনার পরও ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। তার পোশাক, চলাফেরা, বন্ধুত্ব কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে শুরু হয় অমানবিক আলোচনা। অথচ খুব কম মানুষ অপরাধীর মানসিকতা নিয়ে কথা বলে। এই বিকৃত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।

আইন আছে, শাস্তির ব্যবস্থাও আছে। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—শুধু কঠোর আইন করলেই অপরাধ কমে না। প্রয়োজন দ্রুত বিচার, সঠিক তদন্ত এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করা। বহু মামলায় বছরের পর বছর কেটে যায়, কিন্তু বিচার শেষ হয় না। অনেক পরিবার আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক অবক্ষয়। প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদক, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, পারিবারিক মূল্যবোধের সংকট এবং সহিংস সংস্কৃতির বিস্তার তরুণ সমাজের একাংশকে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। শিশুদের সামনে আমরা কী ধরনের সমাজ রেখে যাচ্ছি—সেই প্রশ্ন আজ খুব জরুরি হয়ে উঠেছে।

একটি বিষয় আমাদের বুঝতে হবে—ধর্ষণ শুধু শারীরিক অপরাধ নয়, এটি ক্ষমতা প্রদর্শনের ভয়ংকর মানসিকতা। যে সমাজে নারীর প্রতি সম্মান কমে যায়, যে সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ চুপ থাকে, সেই সমাজেই এমন অপরাধ বাড়তে থাকে। তাই শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না; পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক সংস্কৃতির ভেতরেও পরিবর্তন আনতে হবে।

পরিবার থেকেই শিশুদের মানবিক শিক্ষা দিতে হবে। ছেলে সন্তানকে শেখাতে হবে—নারী কোনো বস্তু নয়, একজন পূর্ণ মানুষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা ও কাউন্সেলিং জোরদার করতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতনতার ভূমিকা পালন করতে হবে। গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে, যাতে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন না করে বরং সম্মান ও সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

আজ প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। কারণ ধর্ষক শুধু একজন ব্যক্তির শত্রু নয়, সে পুরো সমাজের শত্রু। একজন ধর্ষকের বিচার নিশ্চিত না হওয়া মানে ভবিষ্যতে আরও অপরাধের পথ খুলে দেওয়া।

রামিসার ছোট্ট জীবন হয়তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা হয়ে থাকতে পারে। আমরা যদি এখনো না জাগি, তাহলে আগামী দিনে আরও অসংখ্য রামিসা এই অন্ধকারের শিকার হবে।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার নারী ও শিশু কতটা নিরাপদ, তার ওপর নির্ভর করে। তাই এখন সময় এসেছে শুধু আবেগ দেখানোর নয়, বাস্তব পরিবর্তনের। মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করতেই হবে। কারণ প্রতিটি শিশুর হাসি নিরাপদ রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।

লেখক : মীযানুর রহমান

মহাসচিব, পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি

আপনার মতামত লিখুন

পরিবেশ কন্ঠ

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬


রামিসার কান্না কি শুধু আরেকটি শিরোনাম হয়েই থাকবে?

প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

featured Image

একটি ছোট্ট শিশু। নাম তার রামিসা। পৃথিবীটাকে ঠিকমতো চিনে ওঠার আগেই তাকে নির্মমতার শিকার হতে হলো। তার নিষ্পাপ চোখের স্বপ্ন, মায়ের কোল, স্কুলের খাতা—সবকিছু মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল একদল বিবেকহীন মানুষের পাশবিকতায়। রামিসার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের হৃদয় ভেঙে দেয়নি, এটি পুরো বাংলাদেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ভয়ংকর প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই বদলাচ্ছি, নাকি প্রতিটি ঘটনার পর কিছুদিন কান্না করে আবারও সব ভুলে যাচ্ছি?

আজ বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো নারী ও শিশু নিরাপত্তা। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর খবর। কোথাও স্কুলছাত্রী, কোথাও গৃহবধূ, কোথাও আবার মাত্র কয়েক বছরের শিশু। এ যেন এক নীরব সামাজিক মহামারি, যা ধীরে ধীরে আমাদের মানবিকতা গ্রাস করে নিচ্ছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর শত শত নারী ও শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। বাস্তবতা আরও ভয়াবহ, কারণ অসংখ্য ঘটনা সামাজিক লজ্জা, ভয়, হুমকি কিংবা প্রভাবশালীদের চাপের কারণে প্রকাশই পায় না। গ্রামের অনেক পরিবার এখনও “সম্মানের” ভয়ে ধর্ষণের অভিযোগ পর্যন্ত করতে চায় না। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—আমরা ধীরে ধীরে ভয়ংকর এক অসংবেদনশীল সমাজে পরিণত হচ্ছি। একটি ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকদিন তীব্র আলোচনা হয়, মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে, মিছিল হয়, মানববন্ধন হয়, তারপর আবার সব নীরব। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারটির জীবন আর কখনো স্বাভাবিক হয় না। একজন মা তার সন্তানের শূন্য বিছানা দেখে প্রতিদিন ভেঙে পড়েন, একজন বাবা সমাজের সামনে মাথা নিচু করে বেঁচে থাকেন, আর একটি শিশু আজীবনের জন্য মানসিক যন্ত্রণার ভার বহন করে।

আমাদের সমাজে নারীকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে মানুষ হিসেবে নয়, বরং দুর্বল একটি সত্তা হিসেবে দেখা হয়। ধর্ষণের ঘটনার পরও ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। তার পোশাক, চলাফেরা, বন্ধুত্ব কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে শুরু হয় অমানবিক আলোচনা। অথচ খুব কম মানুষ অপরাধীর মানসিকতা নিয়ে কথা বলে। এই বিকৃত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।

আইন আছে, শাস্তির ব্যবস্থাও আছে। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—শুধু কঠোর আইন করলেই অপরাধ কমে না। প্রয়োজন দ্রুত বিচার, সঠিক তদন্ত এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করা। বহু মামলায় বছরের পর বছর কেটে যায়, কিন্তু বিচার শেষ হয় না। অনেক পরিবার আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক অবক্ষয়। প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদক, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, পারিবারিক মূল্যবোধের সংকট এবং সহিংস সংস্কৃতির বিস্তার তরুণ সমাজের একাংশকে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। শিশুদের সামনে আমরা কী ধরনের সমাজ রেখে যাচ্ছি—সেই প্রশ্ন আজ খুব জরুরি হয়ে উঠেছে।

একটি বিষয় আমাদের বুঝতে হবে—ধর্ষণ শুধু শারীরিক অপরাধ নয়, এটি ক্ষমতা প্রদর্শনের ভয়ংকর মানসিকতা। যে সমাজে নারীর প্রতি সম্মান কমে যায়, যে সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ চুপ থাকে, সেই সমাজেই এমন অপরাধ বাড়তে থাকে। তাই শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না; পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক সংস্কৃতির ভেতরেও পরিবর্তন আনতে হবে।

পরিবার থেকেই শিশুদের মানবিক শিক্ষা দিতে হবে। ছেলে সন্তানকে শেখাতে হবে—নারী কোনো বস্তু নয়, একজন পূর্ণ মানুষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা ও কাউন্সেলিং জোরদার করতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতনতার ভূমিকা পালন করতে হবে। গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে, যাতে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন না করে বরং সম্মান ও সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

আজ প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। কারণ ধর্ষক শুধু একজন ব্যক্তির শত্রু নয়, সে পুরো সমাজের শত্রু। একজন ধর্ষকের বিচার নিশ্চিত না হওয়া মানে ভবিষ্যতে আরও অপরাধের পথ খুলে দেওয়া।

রামিসার ছোট্ট জীবন হয়তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা হয়ে থাকতে পারে। আমরা যদি এখনো না জাগি, তাহলে আগামী দিনে আরও অসংখ্য রামিসা এই অন্ধকারের শিকার হবে।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার নারী ও শিশু কতটা নিরাপদ, তার ওপর নির্ভর করে। তাই এখন সময় এসেছে শুধু আবেগ দেখানোর নয়, বাস্তব পরিবর্তনের। মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করতেই হবে। কারণ প্রতিটি শিশুর হাসি নিরাপদ রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।

লেখক : মীযানুর রহমান

মহাসচিব, পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি


পরিবেশ কন্ঠ

সম্পাদক: ড. মোহাম্মদ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মীযানুর রহমান

কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ