সম্প্রতি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)-তে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিজ বিভাগের এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের এক প্রভাষক শিক্ষা সফরের সময় এক ছাত্রীকে অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করেন। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কমিটি অভিযুক্ত শিক্ষককে সাময়িকভাবে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তাকে কোনো শিক্ষা সফরের দায়িত্ব না দেওয়ার কথাও জানানো হয়। তবে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এবং সচেতন মহল মনে করছে—এটি অপরাধের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত পদক্ষেপ। কারণ যৌন হয়রানির অভিযোগ কেবল প্রশাসনিকভাবে সাময়িক অব্যাহতির মাধ্যমে শেষ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয় নয়; এটি আইনি ও নৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুতর অপরাধ।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা সামাজিক চাপ, ক্যারিয়ার ধ্বংসের ভয়, পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা এবং পারিবারিক সংকোচের কারণে মুখ খুলতে পারেন না। ফলে অনেক ঘটনা নীরবেই চাপা পড়ে যায়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যদিও অধিকাংশ ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পায় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার অভাব এর অন্যতম কারণ।
২০০৯ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছিল। সেখানে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক কমিটি গঠনের নির্দেশ ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো সেই নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়নি অথবা থাকলেও তা অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
যবিপ্রবির ঘটনাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা। অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে বিষয়টি মুচলেকার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। যদি এমন অভিযোগ সত্য হয়, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ কোনো যৌন হয়রানির অভিযোগকে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা ভুক্তভোগীর প্রতি অবিচার এবং অপরাধীকে উৎসাহ দেওয়ার শামিল।
বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্ত চিন্তা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার জায়গা। সেখানে কোনো শিক্ষার্থী যদি নিজেকে অনিরাপদ মনে করে, তাহলে সেটি পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি, যেখানে নারী প্রতিনিধি, আইনজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকবে। একই সঙ্গে অপরাধ প্রমাণিত হলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষকের পরিচয় কখনো ক্ষমতার ঢাল হতে পারে না। যারা এই মহান পেশাকে কলুষিত করে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ একটি নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
আজ প্রশ্ন একটাই—শিক্ষাঙ্গন কি জ্ঞানের আলো ছড়াবে, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহারে অন্ধকারের জায়গায় পরিণত হবে? সেই উত্তর নির্ভর করছে এখন প্রশাসনের সাহসী ও স্বচ্ছ পদক্ষেপের ওপর।
লেখক: মীযানুর রহমান
মহাসচিব, পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি
বিষয় : মতামত ছাপা সংস্করণ আজকের মতামত সম্পাদকীয়

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
সম্প্রতি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)-তে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিজ বিভাগের এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের এক প্রভাষক শিক্ষা সফরের সময় এক ছাত্রীকে অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করেন। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কমিটি অভিযুক্ত শিক্ষককে সাময়িকভাবে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তাকে কোনো শিক্ষা সফরের দায়িত্ব না দেওয়ার কথাও জানানো হয়। তবে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এবং সচেতন মহল মনে করছে—এটি অপরাধের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত পদক্ষেপ। কারণ যৌন হয়রানির অভিযোগ কেবল প্রশাসনিকভাবে সাময়িক অব্যাহতির মাধ্যমে শেষ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয় নয়; এটি আইনি ও নৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুতর অপরাধ।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা সামাজিক চাপ, ক্যারিয়ার ধ্বংসের ভয়, পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা এবং পারিবারিক সংকোচের কারণে মুখ খুলতে পারেন না। ফলে অনেক ঘটনা নীরবেই চাপা পড়ে যায়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যদিও অধিকাংশ ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পায় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার অভাব এর অন্যতম কারণ।
২০০৯ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছিল। সেখানে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক কমিটি গঠনের নির্দেশ ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো সেই নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়নি অথবা থাকলেও তা অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
যবিপ্রবির ঘটনাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা। অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে বিষয়টি মুচলেকার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। যদি এমন অভিযোগ সত্য হয়, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ কোনো যৌন হয়রানির অভিযোগকে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা ভুক্তভোগীর প্রতি অবিচার এবং অপরাধীকে উৎসাহ দেওয়ার শামিল।
বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্ত চিন্তা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার জায়গা। সেখানে কোনো শিক্ষার্থী যদি নিজেকে অনিরাপদ মনে করে, তাহলে সেটি পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি, যেখানে নারী প্রতিনিধি, আইনজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকবে। একই সঙ্গে অপরাধ প্রমাণিত হলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষকের পরিচয় কখনো ক্ষমতার ঢাল হতে পারে না। যারা এই মহান পেশাকে কলুষিত করে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ একটি নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
আজ প্রশ্ন একটাই—শিক্ষাঙ্গন কি জ্ঞানের আলো ছড়াবে, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহারে অন্ধকারের জায়গায় পরিণত হবে? সেই উত্তর নির্ভর করছে এখন প্রশাসনের সাহসী ও স্বচ্ছ পদক্ষেপের ওপর।
লেখক: মীযানুর রহমান
মহাসচিব, পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি

আপনার মতামত লিখুন