ইরানের গণমাধ্যম ও দেশটির কট্টরপন্থি রাজনৈতিক মহল এখন হরমুজ প্রণালিকে শুধু জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক ইন্টারনেট যোগাযোগের একটি কৌশলগত রুট হিসেবেও তুলে ধরছে। তারা মনে করে, ইরানের নতুন চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার লুকিয়ে আছে হরমুজ প্রণালির পানির নিচ দিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক ডেটা ক্যাবলসে। এই আলোচনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষের পর ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে।
ইরানের গণমাধ্যম ও কট্টরপন্থি রাজনৈতিক মহলের ঐ বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন ক্যাবলসের ওপর ইরান নজরদারি বা তদারকি করতে পারে। অর্থাৎ, এসব ক্যাবলসের নিরাপত্তা ও ব্যবহারের বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে। এমনকি এগুলো ব্যবহারের জন্য ফিও আদায় করতে পারে। যদিও বাস্তবে এমন পদক্ষেপ নিতে গেলে ইরানকে অনেক আইনি ও প্রযুক্তিগত বাধার মুখে পড়তে হবে, তবুও এই আলোচনা প্রমাণ করে যে, দেশটি শুধু তেলবাহী ট্যাংকার নয়, এবার গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোকেও কৌশলগত চাপ তৈরির উপায় হিসেবে বিবেচনা করছে।
হরমুজ প্রণালি বিরোধে নতুন ইস্যু?দশকের পর দশক ধরে হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কারণ, সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল এই সরু জলপথ দিয়েই যাতায়াত করে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি গত ৮ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ক্যাবলসকে চাপ প্রয়োগের সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ধারণাটিকে সামনে আনে। এসব কেবল ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ ও আর্থিক তথ্য আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
টেলিকমিউনিকেশন সার্ভিস প্রোভাইডার টাটা কমিউনিকেশনসের তথ্য অনুযায়ী, ফ্যালকন, জিবিআই ও টিজিএন-গালফসহ বেশ কয়েকটি বড় ক্যাবলস নেটওয়ার্ক হরমুজ প্রণালি দিয়ে গেছে। এগুলোর মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে ডেটা আদান-প্রদান হয়। বিশেষ করে টিজিএন-গালফ কেবল ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরবকে বৈশ্বিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফার্স নিউজ এজেন্সি জোর দিয়ে এটাও বলেছে যে, গুগল, মেটা, মাইক্রোসফটের মতো বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি এসব ক্যাবলসের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক এসডব্লিউআইএফটি-ও হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া এই অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে।
হরমুজ প্রণালির অবস্থানের কারণে তেল পরিবহন রুটের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ডেটা পরিবহন রুটের ওপরও ইরানের ভৌগোলিক প্রভাব রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বিংশ শতাব্দীতে তেল যদি হয় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি, তাহলে একবিংশ শতাব্দীতে সেই জায়গা নিয়েছে ডেটা। আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ আরেক গণমাধ্যম মাশরেক নিউজও একই কথা বলছে। তারা সমুদ্রতলের ক্যাবলস 'ইরানের নীরব অস্ত্র' বলে হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই আলোচনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইরানি কর্মকর্তারা বারবার বলছেন যে, তেহরান তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করছে।এর আগে তারা বারবার অভিযোগ করছেন যে, উপসাগরীয় কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে সহায়তা করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে 'নতুন সমীকরণে' ডিজিটাল অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইরানের সংসদ সদস্য এশান ঘাযিযাদেহ হাশেমি গত ২ মে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-কে বলেন, আইনপ্রণেতারা নতুন একটি 'অ্যাকশন প্ল্যান' তৈরি করছেন। হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলপথে সমুদ্রতলের ডেটা ক্যাবলদ নিয়ে কোনো কাজ করতে হলে আগে অবশ্যই ইরান সরকারের অনুমতি নিতে হবে। এর মধ্যে সেই ক্যাবলস কোথা দিয়ে যাবে, কীভাবে বসানো হবে, কীভাবে পরিচালনা বা মেরামত করা হবে, কিংবা পরে এর পথ পরিবর্তন করা হবে কি না-এসব বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া, এসব কাজের জন্য ইরানকে সার্ভিস চার্জও দিতে হতে পারে বলে তিনি জানান।
সাবমেরিন ক্যাবলস-ই কেন?এপ্রিলের শেষদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় ৯৯ শতাংশ সাবমেরিন ক্যাবলসের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফি জানিয়েছে, এইই-ওয়ান, ফ্যালকন ও গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্কের ক্যাবলস হরমুজ প্রণালি দিয়ে গেছে। ফলে এঐ এলাকায় বড় ধরনের কোনো সমস্যা হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ইন্টারনেট, ব্যাংকিং কার্যক্রম ও ব্যাবসায়িক নেটওয়ার্কে প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন হিসাবের উদ্ধৃতি দিয়ে ফার্স নিউজ এজেন্সি লিখেছে, সমুদ্রতলের এই ক্যাবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিদিন বিশ্ব জুড়ে ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হ্যা। সংবাদমাধ্যমটি আরো বলেছে, এসব নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটলে কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েক কোটি বা শত কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। আর সে কারণেই বিষয়টি এখন শুধু প্রযুক্তিগত ইস্যু নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
ঠিক কী করার কথা বলা হচ্ছে?ইরানের গণমাধ্যম ও সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা সরাসরি সাবমেরিন ক্যাবলস কেটে দেওয়া বা দখল করার কথা বলেননি। বরং তাদের আলোচনার মূল বিষয় ছিল ক্যাবলস ব্যবহারের ওপর টোল আদায়, ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মকানুন প্রয়োগ। তাদের মতে, এর মাধ্যমে ইরান অর্থ আয়ও করতে পারে। ফার্সের দাবি, এসব প্রস্তাব বাস্তবসম্মত এবং হরমুজ প্রণালিকে শুধু জ্বালানি পরিবহনের পথ নয়, বরং ইরানের ডিজিটাল ও অর্থনৈতিক
শক্তির অংশ হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। ইরানের কি সত্যিই এমন আইনি ক্ষমতা আছে?আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো মূলত সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘ কনভেনশন নিয়ে ইরানের নিজস্ব ব্যাখ্যার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, বৈশ্বিক যোগাযোগ অবকাঠামো বা ডেটা প্রবাহের ওপর ইরানের এত বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি সহজে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। অর্থাৎ, ইরান চাইলে একতরফাভাবে পুরো ডেটা চলাচলের ওপর সীমাহীন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে, এমন ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক আইন সমর্থন নাও করতে পারে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো বড় শক্তিগুলো সম্ভবত বৈশ্বিক ইন্টারনেট অবকাঠামোর ওপর ইরানের একতরফা নিয়ন্ত্রণ বা ফি আরোপের চেষ্টা মেনে নেবে না।
কেন এখন এই আলোচনা সামনে আসছে?এখানে সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। এমন এক সময়ে এই আলোচনা সামনে এসেছে, যখন ইরান হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন ধরনের চাপ প্রয়োগের কৌশল সামনে আনছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়া সম্ভব না বিধায় ইরান কীভাবে বিকল্প উপায়ে চাপ প্রয়োগ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার কৌশল ভাবছে। অর্থাৎ, তেহরান এখন এমন সব উপায় খুঁজছে, যেগুলোর মাধ্যমে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই কৌশলগত প্রভাব তৈরি করা যায়।
সূত্র: বিবিসি

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
ইরানের গণমাধ্যম ও দেশটির কট্টরপন্থি রাজনৈতিক মহল এখন হরমুজ প্রণালিকে শুধু জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক ইন্টারনেট যোগাযোগের একটি কৌশলগত রুট হিসেবেও তুলে ধরছে। তারা মনে করে, ইরানের নতুন চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার লুকিয়ে আছে হরমুজ প্রণালির পানির নিচ দিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক ডেটা ক্যাবলসে। এই আলোচনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষের পর ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে।
ইরানের গণমাধ্যম ও কট্টরপন্থি রাজনৈতিক মহলের ঐ বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন ক্যাবলসের ওপর ইরান নজরদারি বা তদারকি করতে পারে। অর্থাৎ, এসব ক্যাবলসের নিরাপত্তা ও ব্যবহারের বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে। এমনকি এগুলো ব্যবহারের জন্য ফিও আদায় করতে পারে। যদিও বাস্তবে এমন পদক্ষেপ নিতে গেলে ইরানকে অনেক আইনি ও প্রযুক্তিগত বাধার মুখে পড়তে হবে, তবুও এই আলোচনা প্রমাণ করে যে, দেশটি শুধু তেলবাহী ট্যাংকার নয়, এবার গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোকেও কৌশলগত চাপ তৈরির উপায় হিসেবে বিবেচনা করছে।
হরমুজ প্রণালি বিরোধে নতুন ইস্যু?দশকের পর দশক ধরে হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কারণ, সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল এই সরু জলপথ দিয়েই যাতায়াত করে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি গত ৮ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ক্যাবলসকে চাপ প্রয়োগের সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ধারণাটিকে সামনে আনে। এসব কেবল ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ ও আর্থিক তথ্য আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
টেলিকমিউনিকেশন সার্ভিস প্রোভাইডার টাটা কমিউনিকেশনসের তথ্য অনুযায়ী, ফ্যালকন, জিবিআই ও টিজিএন-গালফসহ বেশ কয়েকটি বড় ক্যাবলস নেটওয়ার্ক হরমুজ প্রণালি দিয়ে গেছে। এগুলোর মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে ডেটা আদান-প্রদান হয়। বিশেষ করে টিজিএন-গালফ কেবল ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরবকে বৈশ্বিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফার্স নিউজ এজেন্সি জোর দিয়ে এটাও বলেছে যে, গুগল, মেটা, মাইক্রোসফটের মতো বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি এসব ক্যাবলসের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক এসডব্লিউআইএফটি-ও হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া এই অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে।
হরমুজ প্রণালির অবস্থানের কারণে তেল পরিবহন রুটের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ডেটা পরিবহন রুটের ওপরও ইরানের ভৌগোলিক প্রভাব রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বিংশ শতাব্দীতে তেল যদি হয় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি, তাহলে একবিংশ শতাব্দীতে সেই জায়গা নিয়েছে ডেটা। আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ আরেক গণমাধ্যম মাশরেক নিউজও একই কথা বলছে। তারা সমুদ্রতলের ক্যাবলস 'ইরানের নীরব অস্ত্র' বলে হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই আলোচনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইরানি কর্মকর্তারা বারবার বলছেন যে, তেহরান তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করছে।এর আগে তারা বারবার অভিযোগ করছেন যে, উপসাগরীয় কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমে সহায়তা করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে 'নতুন সমীকরণে' ডিজিটাল অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইরানের সংসদ সদস্য এশান ঘাযিযাদেহ হাশেমি গত ২ মে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-কে বলেন, আইনপ্রণেতারা নতুন একটি 'অ্যাকশন প্ল্যান' তৈরি করছেন। হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলপথে সমুদ্রতলের ডেটা ক্যাবলদ নিয়ে কোনো কাজ করতে হলে আগে অবশ্যই ইরান সরকারের অনুমতি নিতে হবে। এর মধ্যে সেই ক্যাবলস কোথা দিয়ে যাবে, কীভাবে বসানো হবে, কীভাবে পরিচালনা বা মেরামত করা হবে, কিংবা পরে এর পথ পরিবর্তন করা হবে কি না-এসব বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া, এসব কাজের জন্য ইরানকে সার্ভিস চার্জও দিতে হতে পারে বলে তিনি জানান।
সাবমেরিন ক্যাবলস-ই কেন?এপ্রিলের শেষদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় ৯৯ শতাংশ সাবমেরিন ক্যাবলসের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফি জানিয়েছে, এইই-ওয়ান, ফ্যালকন ও গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্কের ক্যাবলস হরমুজ প্রণালি দিয়ে গেছে। ফলে এঐ এলাকায় বড় ধরনের কোনো সমস্যা হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ইন্টারনেট, ব্যাংকিং কার্যক্রম ও ব্যাবসায়িক নেটওয়ার্কে প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন হিসাবের উদ্ধৃতি দিয়ে ফার্স নিউজ এজেন্সি লিখেছে, সমুদ্রতলের এই ক্যাবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিদিন বিশ্ব জুড়ে ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হ্যা। সংবাদমাধ্যমটি আরো বলেছে, এসব নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটলে কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েক কোটি বা শত কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। আর সে কারণেই বিষয়টি এখন শুধু প্রযুক্তিগত ইস্যু নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
ঠিক কী করার কথা বলা হচ্ছে?ইরানের গণমাধ্যম ও সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা সরাসরি সাবমেরিন ক্যাবলস কেটে দেওয়া বা দখল করার কথা বলেননি। বরং তাদের আলোচনার মূল বিষয় ছিল ক্যাবলস ব্যবহারের ওপর টোল আদায়, ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মকানুন প্রয়োগ। তাদের মতে, এর মাধ্যমে ইরান অর্থ আয়ও করতে পারে। ফার্সের দাবি, এসব প্রস্তাব বাস্তবসম্মত এবং হরমুজ প্রণালিকে শুধু জ্বালানি পরিবহনের পথ নয়, বরং ইরানের ডিজিটাল ও অর্থনৈতিক
শক্তির অংশ হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। ইরানের কি সত্যিই এমন আইনি ক্ষমতা আছে?আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো মূলত সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘ কনভেনশন নিয়ে ইরানের নিজস্ব ব্যাখ্যার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, বৈশ্বিক যোগাযোগ অবকাঠামো বা ডেটা প্রবাহের ওপর ইরানের এত বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি সহজে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। অর্থাৎ, ইরান চাইলে একতরফাভাবে পুরো ডেটা চলাচলের ওপর সীমাহীন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে, এমন ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক আইন সমর্থন নাও করতে পারে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো বড় শক্তিগুলো সম্ভবত বৈশ্বিক ইন্টারনেট অবকাঠামোর ওপর ইরানের একতরফা নিয়ন্ত্রণ বা ফি আরোপের চেষ্টা মেনে নেবে না।
কেন এখন এই আলোচনা সামনে আসছে?এখানে সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। এমন এক সময়ে এই আলোচনা সামনে এসেছে, যখন ইরান হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন ধরনের চাপ প্রয়োগের কৌশল সামনে আনছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়া সম্ভব না বিধায় ইরান কীভাবে বিকল্প উপায়ে চাপ প্রয়োগ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার কৌশল ভাবছে। অর্থাৎ, তেহরান এখন এমন সব উপায় খুঁজছে, যেগুলোর মাধ্যমে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই কৌশলগত প্রভাব তৈরি করা যায়।
সূত্র: বিবিসি

আপনার মতামত লিখুন