পরিবেশ কন্ঠ

কেন বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিতে এবং কেন তরুণদের সোচ্চার হওয়া জরুরি

জলবায়ু ন্যায়বিচার ও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা



জলবায়ু ন্যায়বিচার ও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা
সংগৃহীত

কার্বন নিঃসরণে দায় নগণ্য হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চরম ঝুঁকিতে বাংলাদেশ; ক্ষতিপূরণ ও অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়ার এখনই সময়।

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে করাল গ্রাস, তার রেশ আজ প্রতিটি ঋতুতে স্পষ্ট। কখনো অকাল বন্যা, কখনো দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কখনো বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়—প্রকৃতির এই রুদ্রমূপ আমাদের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। জার্মানভিত্তিক সংস্থা ‘জার্মানওয়াচ’-এর জলবায়ু ঝুঁকি সূচক ২০২৬ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের আইপিসিসি-র তথ্যমতে, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে এদেশের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে।

অথচ একটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়—এই বিপর্যয়ে আমাদের দায় কতটুকু? বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য হলেও এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে এদেশের সাধারণ মানুষকে। এখানেই উঠে আসে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ বা ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’-এর প্রসঙ্গ। উন্নত দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে কলকারখানা ও জীবাশ্ম জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে, যার ফলে বায়ুমণ্ডলে বেড়েছে কার্বনের মাত্রা। এই ঐতিহাসিক অবিচারের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো। তাই উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর দাবি জানানো কোনো করুণা নয়, বরং এটি আমাদের অধিকার।

ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক মো. হাফিজুর রহমান মনে করেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কেবল অর্থায়নই যথেষ্ট নয়। তিনি জোর দিয়েছেন তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর। তার মতে, আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। যদি পৃথিবীটাই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে, তবে সেই নেতৃত্বের কোনো সার্থকতা থাকবে না। তাই তরুণ প্রজন্মকে জলবায়ু সংকট সম্পর্কে আরও বিশদভাবে জানতে হবে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দিতে হবে।

তরুণদের এই আন্দোলনের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে ইংল্যান্ডের রয়েল কমনওয়েলথ সোসাইটি পুরস্কারপ্রাপ্ত অধিকারকর্মী আরুবা ফারুকের বক্তব্যে। তিনি মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি সরাসরি মানবাধিকারের ওপর আঘাত। যারা দূষণ কম করেছে তারাই কেন বেশি ভুগবে—এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আজ তরুণ সমাজকে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। ইয়ুথনেট গ্লোবালের মতো সংগঠনগুলো তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে তরুণদের ঐক্যবদ্ধ করছে, যাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু ন্যায়বিচারের জোরালো দাবি উত্থাপন করা যায়।

পরিশেষে, জলবায়ু ন্যায়বিচার আদায়ের লড়াই একটি দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রাম। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে তরুণদের জ্ঞান, দক্ষতা ও নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। উন্নত বিশ্বের প্রতিশ্রুতিগুলো যাতে কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে তরুণদের সোচ্চার হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আমাদের টিকে থাকার লড়াই এবং বাসযোগ্য ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা পেতে আজই একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে সময়।

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ

আপনার মতামত লিখুন

পরিবেশ কন্ঠ

সোমবার, ১১ মে ২০২৬


জলবায়ু ন্যায়বিচার ও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা

প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬

featured Image

কার্বন নিঃসরণে দায় নগণ্য হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চরম ঝুঁকিতে বাংলাদেশ; ক্ষতিপূরণ ও অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়ার এখনই সময়।

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে করাল গ্রাস, তার রেশ আজ প্রতিটি ঋতুতে স্পষ্ট। কখনো অকাল বন্যা, কখনো দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কখনো বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়—প্রকৃতির এই রুদ্রমূপ আমাদের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। জার্মানভিত্তিক সংস্থা ‘জার্মানওয়াচ’-এর জলবায়ু ঝুঁকি সূচক ২০২৬ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের আইপিসিসি-র তথ্যমতে, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে এদেশের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে।

অথচ একটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়—এই বিপর্যয়ে আমাদের দায় কতটুকু? বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য হলেও এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে এদেশের সাধারণ মানুষকে। এখানেই উঠে আসে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ বা ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’-এর প্রসঙ্গ। উন্নত দেশগুলো দীর্ঘকাল ধরে কলকারখানা ও জীবাশ্ম জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে, যার ফলে বায়ুমণ্ডলে বেড়েছে কার্বনের মাত্রা। এই ঐতিহাসিক অবিচারের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো। তাই উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর দাবি জানানো কোনো করুণা নয়, বরং এটি আমাদের অধিকার।

ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক মো. হাফিজুর রহমান মনে করেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কেবল অর্থায়নই যথেষ্ট নয়। তিনি জোর দিয়েছেন তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর। তার মতে, আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। যদি পৃথিবীটাই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে, তবে সেই নেতৃত্বের কোনো সার্থকতা থাকবে না। তাই তরুণ প্রজন্মকে জলবায়ু সংকট সম্পর্কে আরও বিশদভাবে জানতে হবে এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দিতে হবে।

তরুণদের এই আন্দোলনের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে ইংল্যান্ডের রয়েল কমনওয়েলথ সোসাইটি পুরস্কারপ্রাপ্ত অধিকারকর্মী আরুবা ফারুকের বক্তব্যে। তিনি মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি সরাসরি মানবাধিকারের ওপর আঘাত। যারা দূষণ কম করেছে তারাই কেন বেশি ভুগবে—এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আজ তরুণ সমাজকে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। ইয়ুথনেট গ্লোবালের মতো সংগঠনগুলো তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে তরুণদের ঐক্যবদ্ধ করছে, যাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু ন্যায়বিচারের জোরালো দাবি উত্থাপন করা যায়।

পরিশেষে, জলবায়ু ন্যায়বিচার আদায়ের লড়াই একটি দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রাম। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে তরুণদের জ্ঞান, দক্ষতা ও নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। উন্নত বিশ্বের প্রতিশ্রুতিগুলো যাতে কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে তরুণদের সোচ্চার হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আমাদের টিকে থাকার লড়াই এবং বাসযোগ্য ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা পেতে আজই একতাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে সময়।

পরি-কন্ঠ/মুয়াজ


পরিবেশ কন্ঠ

সম্পাদক: ডা. মো: সেলিম রেজা
প্রকাশক: মীযানুর রহমান

কপিরাইট © ২০২৬ পরিবেশ কন্ঠ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত