পরিবেশ কন্ঠ

লেকের জলে নয়, বিষাক্ত বর্জ্যে তলিয়ে গেলো গোটা শহর


প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

লেকের জলে নয়, বিষাক্ত বর্জ্যে তলিয়ে গেলো গোটা শহর
শিল্পকারখানার বর্জ্য তলিয়ে যাওয়া শহর গিয়ামানা (ছবি: সংগৃহীত)

চারদিকে পাহাড়, সবুজের সমারোহ আর একসময়কার মনোরম লেক। একদম ছবির মতো সুন্দর ছিল রোমানিয়ার ছোট্ট শহর গিয়ামানা। কিন্তু তামা উত্তোলনের জন্য গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার বর্জ্য ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছে সেই চেনা ভূদৃশ্য। একসময় যেখানে মানুষের বসতি ছিল, সেখানে এখন বিস্তীর্ণ এলাকা ঢেকে রয়েছে বিষাক্ত বর্জ্যে। কাদামাটি ও বর্জ্যের স্তূপের মধ্যে আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একটি গির্জার চূড়া। সেটিই যেন হারিয়ে যাওয়া শহরটির শেষ স্মারক।

রোমানিয়ার আপুসেনি পর্বতমালার কাছে অবস্থিত গিয়ামানা গ্রামের এই পরিণতির সূত্রপাত ১৯৭৭ সালে। সে সময় দেশটির কমিউনিস্ট সরকার তামা উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রামের কাছাকাছি একটি তামার খনি ও প্রক্রিয়াকরণকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। খনি থেকে তামা উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণের ফলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য জমা হওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেই বর্জ্য রাখার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে একটি বিশাল জলাধার। আর সেই জলাধার তৈরির পথেই বদলে যায় গিয়ামানার মানুষের জীবন।

সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গ্রামটির জমি অধিগ্রহণ করা হয়। বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং পরিবারপ্রতি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন বিবরণে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ প্রায় ১,৫০০ ইউরো। গ্রামের প্রায় ৩০০ পরিবার নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যায়। তবে সবাই যে সহজে শিকড় উপড়ে ফেলতে পেরেছিলেন, তা নয়। কয়েকটি পরিবার কিছু সময় সেখানে থেকে যায়। পরে বর্জ্য ও জলস্তর বাড়তে থাকায় তাদেরও তুলনামূলক উঁচু এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।

খনি ও কারখানার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে আশপাশের ভূদৃশ্য বদলাতে থাকে। তামা প্রক্রিয়াকরণের পর যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হতো, তা জমা করা হতে থাকে গ্রামের কাছের উপত্যকায়। বর্জ্যের সঙ্গে মিশে থাকা জল ও রাসায়নিক উপাদান ক্রমে বিস্তীর্ণ এলাকাকে ঢেকে ফেলে। একসময় যে জায়গায় ছিল বাড়িঘর, রাস্তা, চাষের জমি ও সবুজ প্রকৃতি, সেখানে তৈরি হয় অস্বাভাবিক রঙের কাদাময় জলাধার। গ্রামের নিচু অংশগুলো একে একে বর্জ্যের স্তূপের তলায় হারিয়ে যেতে থাকে।

গিয়ামানার এই পরিবর্তন এক-দুই বছরের ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরে চলা খনি কার্যক্রম ও বর্জ্য জমার ফলে ধীরে ধীরে গ্রামটির বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একসময়কার লেক ও তার আশপাশের সৌন্দর্যও হারিয়ে যায় শিল্পবর্জ্যের চাপে।

আজ গিয়ামানায় গেলে চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য। দূর থেকে মনে হয়, পাহাড়ের কোলে ছড়িয়ে রয়েছে রঙিন কাদা ও বর্জ্যে ভরা বিশাল জলাধার। তার মাঝখানে বা বর্জ্যে ঘেরা এলাকায় দেখা যায় পুরনো গির্জার চূড়া। একসময় যে গির্জা ছিল স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এখন সেটিই পরিত্যক্ত গ্রামের অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করছে। চারপাশের বাড়িঘর ও বসতির অধিকাংশ হারিয়ে গেলেও গির্জার এই অংশ যেন অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়।

গিয়ামানার কাহিনি শুধু একটি গ্রামের হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি শিল্পায়ন, প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন এবং পরিবেশের ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবেরও উদাহরণ। তামার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতু উৎপাদনের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের আড়ালে কীভাবে একটি জনপদের মানুষের জীবন, স্মৃতি ও বসতভিটে হারিয়ে যেতে পারে, গিয়ামানা তারই এক বাস্তব ছবি। একসময় যে উপত্যকায় মানুষের ঘরবাড়ি ছিল, সেখানে এখন শিল্পবর্জ্যের বিস্তার। আর সেই বর্জ্যের মধ্যে টিকে থাকা গির্জার চূড়া মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের মূল্য কখনও কখনও দিতে হয় একটি গোটা জনপদকে।

বিষয় : নির্বাচিত খবর

আপনার মতামত লিখুন

পরিবেশ কন্ঠ

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


লেকের জলে নয়, বিষাক্ত বর্জ্যে তলিয়ে গেলো গোটা শহর

প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

চারদিকে পাহাড়, সবুজের সমারোহ আর একসময়কার মনোরম লেক। একদম ছবির মতো সুন্দর ছিল রোমানিয়ার ছোট্ট শহর গিয়ামানা। কিন্তু তামা উত্তোলনের জন্য গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার বর্জ্য ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছে সেই চেনা ভূদৃশ্য। একসময় যেখানে মানুষের বসতি ছিল, সেখানে এখন বিস্তীর্ণ এলাকা ঢেকে রয়েছে বিষাক্ত বর্জ্যে। কাদামাটি ও বর্জ্যের স্তূপের মধ্যে আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একটি গির্জার চূড়া। সেটিই যেন হারিয়ে যাওয়া শহরটির শেষ স্মারক।

রোমানিয়ার আপুসেনি পর্বতমালার কাছে অবস্থিত গিয়ামানা গ্রামের এই পরিণতির সূত্রপাত ১৯৭৭ সালে। সে সময় দেশটির কমিউনিস্ট সরকার তামা উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রামের কাছাকাছি একটি তামার খনি ও প্রক্রিয়াকরণকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। খনি থেকে তামা উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণের ফলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য জমা হওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেই বর্জ্য রাখার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে একটি বিশাল জলাধার। আর সেই জলাধার তৈরির পথেই বদলে যায় গিয়ামানার মানুষের জীবন।

সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গ্রামটির জমি অধিগ্রহণ করা হয়। বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং পরিবারপ্রতি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন বিবরণে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ প্রায় ১,৫০০ ইউরো। গ্রামের প্রায় ৩০০ পরিবার নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যায়। তবে সবাই যে সহজে শিকড় উপড়ে ফেলতে পেরেছিলেন, তা নয়। কয়েকটি পরিবার কিছু সময় সেখানে থেকে যায়। পরে বর্জ্য ও জলস্তর বাড়তে থাকায় তাদেরও তুলনামূলক উঁচু এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।

খনি ও কারখানার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে আশপাশের ভূদৃশ্য বদলাতে থাকে। তামা প্রক্রিয়াকরণের পর যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হতো, তা জমা করা হতে থাকে গ্রামের কাছের উপত্যকায়। বর্জ্যের সঙ্গে মিশে থাকা জল ও রাসায়নিক উপাদান ক্রমে বিস্তীর্ণ এলাকাকে ঢেকে ফেলে। একসময় যে জায়গায় ছিল বাড়িঘর, রাস্তা, চাষের জমি ও সবুজ প্রকৃতি, সেখানে তৈরি হয় অস্বাভাবিক রঙের কাদাময় জলাধার। গ্রামের নিচু অংশগুলো একে একে বর্জ্যের স্তূপের তলায় হারিয়ে যেতে থাকে।

গিয়ামানার এই পরিবর্তন এক-দুই বছরের ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরে চলা খনি কার্যক্রম ও বর্জ্য জমার ফলে ধীরে ধীরে গ্রামটির বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একসময়কার লেক ও তার আশপাশের সৌন্দর্যও হারিয়ে যায় শিল্পবর্জ্যের চাপে।

আজ গিয়ামানায় গেলে চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য। দূর থেকে মনে হয়, পাহাড়ের কোলে ছড়িয়ে রয়েছে রঙিন কাদা ও বর্জ্যে ভরা বিশাল জলাধার। তার মাঝখানে বা বর্জ্যে ঘেরা এলাকায় দেখা যায় পুরনো গির্জার চূড়া। একসময় যে গির্জা ছিল স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এখন সেটিই পরিত্যক্ত গ্রামের অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করছে। চারপাশের বাড়িঘর ও বসতির অধিকাংশ হারিয়ে গেলেও গির্জার এই অংশ যেন অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়।

গিয়ামানার কাহিনি শুধু একটি গ্রামের হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি শিল্পায়ন, প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন এবং পরিবেশের ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবেরও উদাহরণ। তামার মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতু উৎপাদনের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের আড়ালে কীভাবে একটি জনপদের মানুষের জীবন, স্মৃতি ও বসতভিটে হারিয়ে যেতে পারে, গিয়ামানা তারই এক বাস্তব ছবি। একসময় যে উপত্যকায় মানুষের ঘরবাড়ি ছিল, সেখানে এখন শিল্পবর্জ্যের বিস্তার। আর সেই বর্জ্যের মধ্যে টিকে থাকা গির্জার চূড়া মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের মূল্য কখনও কখনও দিতে হয় একটি গোটা জনপদকে।


পরিবেশ কন্ঠ

সম্পাদক: ড. মোহাম্মদ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মীযানুর রহমান

কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ