ওষুধের দাম এবং চারটি বিবেচ্য বিষয়
বাংলাদেশে চিকিৎসাব্যয়ের সিংহভাগই মানুষের পকেট থেকে খরচ হয়। আবার এ ব্যয়ের ৬০ শতাংশেরও বেশি খরচ হয় ওষুধ কিনতে। সেজন্য ওষুধের দাম আমাদের স্বাস্থ্যের আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের যেহেতু স্বাস্থ্য বীমা কিংবা রোগীর জন্য আর্থিক সহযোগিতার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই, সেজন্য ভোক্তা পর্যায়ের রোগীকে এই পুরো খরচ বহন করতে হয়। এ পরিস্থিতিতে সরকারের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত ওষুধের দাম নিয়ে নতুন এক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সেটি হলো, অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের জানুয়ারিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও ওষুধের দাম নির্ধারণে যে নীতিমালা করেছিল, বতর্মান নির্বাচিত সরকার তা আইনে পরিণত করেনি। গত মাসে আমরা পিপিআরসির ‘আজকের এজেন্ডা’য় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি, যেখানে ওষুধ খাতের বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তারা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন।
ওষুধের দামের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে চারটি বিষয় মাথায় রাখা খুব জরুরি। প্রথমটি অবশ্যই আমাদের রোগী পর্যায়ে স্বাস্থ্য খরচের বোঝা এবং তার ফলে দারিদ্র্য তৈরির ঝুঁকি। দ্বিতীয় বিবেচ্য বিষয় ওষুধশিল্পের বিকাশ ও অগ্রগতি, যা আমাদের অর্থনীতির একটা শক্তির জায়গা। তৃতীয়ত, ওষুধের দাম নির্ধারণের ফর্মুলাটি সঠিকভাবে ঠিক করতে পারা। সর্বশেষ বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে সার্বিকভাবে সরকারের দায়িত্বসংক্রান্ত; বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি কীভাবে সরকার নিশ্চিত করতে চায় এবং তার অংশ হিসেবে সরকার কীভাবে ওষুধের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারে।
চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে পরিবারগুলো যে ঋণগ্রস্ত হয়ে যায়, তা সাম্প্রতিক হাম চিকিৎসার এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে। উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সহায়তায় পরিচালিত এ গবেষণায় এমনকি এটিও উঠে এসেছে যে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত, খাবার ও হাসপাতালে অবস্থানের আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে আক্রান্ত পরিবারের ৮৯ শতাংশকেই ঋণ করতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টি চিকিৎসাব্যয় চালাতে ধারদেনার ওপর নির্ভর করেছে। এ জরিপের ফল বলে দিচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে ভোক্তা পর্যায়ে আর্থিক বোঝাটা সহনশীল করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। আপাতত পুরোটা না হলেও বিশেষ করে চিকিৎসাব্যয় সহনীয় করা দরকার। আবার ওষুধশিল্পের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও সরকারকে দেখতে হবে। তাই ওষুধের দাম নির্ধারণ যে প্রাইসিং ফর্মুলা, সেখানে জনস্বাস্থ্য এবং শিল্পের বিকাশের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় জরুরি।
ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আরও কিছু বিষয়ও আছে। যেমন–গুণগত মান রক্ষা, সাপ্লাই চেইন (সরবরাহ ব্যবস্থা) ঠিক রাখা; ওষুধশিল্পের সুরক্ষার বিষয়টি ইতোমধ্যে বলেছি। আমরা জানি, বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন তিন বছরের জন্য পেছানোর আবেদন করেছে। ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট তথা মেধাস্বত্ব অধিকারে যেসব সুবিধা আমরা ওষুধশিল্পের বিকাশে পেয়েছি, ২০২৯ সালে আমাদের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর সেগুলো বাতিল হতে পারে। বিশেষ করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা-ডব্লিউটিওর ট্রিপস চুক্তির বিশেষ ছাড় শেষ হলে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প পেটেন্টকৃত ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ বিনা অনুমতিতে তৈরির সুবিধা হারাতে পারে। সেটি লক্ষ্য রেখে ওষুধশিল্প সুরক্ষায় আরএনডি তথা গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই যথাযথ নীতিকাঠামো তৈরির এবং তদারকি বা রেগুলেটরি এনভায়রনমেন্ট যেন থাকে তাও নিশ্চিত করতে হবে। একই রকম জরুরি বিষয় হলো, ওষুধের দাম জনস্বাস্থ্যের একটা অংশ; মানুষের জন্য সহনীয় দামে মানসম্মত ওষুধের ব্যবস্থা করার দায়িত্বও সরকারের।
জনস্বাস্থ্য অনেক বড় বিষয় এবং এর অনেক ডাইমেনশন বা মাত্রা আছে। যেমন আমরা যখন ওষুধের দাম নিয়ে আলোচনা করছি, তখন দেখা গেল চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে অনেক ওষুধ দিয়ে দিচ্ছেন। অযথা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ যাতে কোনো চিকিৎসক না লেখেন, সেখানেও সরকারকে ভূমিকা রাখতে হয়। আরও বড় পারস্পেক্টিভ বা প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে বলতে হয়, মানুষের জন্য ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ বা সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যেন স্বাস্থ্যব্যয় করতে গিয়ে কেউ দারিদ্র্যে না পড়ে। ওষুধ কিনতে গিয়ে কাউকে ঋণ করতে হবে না। দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত ও ব্যয়বহুল ওষুধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সরকার তাদের বিনামূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা এবং আর্থিক অনুদান প্রদানসহ নানা পদক্ষেপ নিতে পারে। ক্যান্সারের মতো জটিল রোগগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন চিন্তাও করা যেতে পারে। রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চাইতে রোগ যাতে না হয়, প্রতিকারের সেই ব্যবস্থা আগে নিতে হবে।
২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের দাম নির্ধারণ নীতিমালা অনুমোদন না করার ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি ছিল, জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ বা আলোচনা না করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এ আইনি বাধ্যবাধকতাগুলোও পুনরায় খতিয়ে দেখা দরকার। ১৯৯৪ সালের ওষুধনীতিতে সরকার ফিরে গেছে, সে সময় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ওষুধের সংখ্যা ছিল ১১৭, যা এখন সংগত কারণে বাড়ার কথা। অস্বীকার করা যাবে না যে ১৯৯৪ সালের জাতীয় ওষুধনীতি বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের স্বাধীন বিকাশ ও মুক্তবাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বড় ও যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। ওষুধের দাম নির্ধারণে বর্তমানে মানুষের স্বাস্থ্যব্যয়ের কথা চিন্তা করতে হবে, সেভাবে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধেরও তালিকা পর্যালোচনা করা দরকার। সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নজর দেওয়ার কথা বলছে, এটি ভালো বিষয়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্তম্ভ হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। সেখানকার অবকাঠামো ঠিক করা, চিকিৎসকের ব্যবস্থা করা এবং সময়মতো ওষুধপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করলে স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গ্রাম ও শহরের চাহিদার আলোকে সেভাবে গড়ে তুলতে হবে।
এসেনসিয়াল ড্রাগস্ কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) বাংলাদেশের শতভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠান, যা সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ওষুধ উৎপাদনের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা পূরণ করে থাকে। সরকারি ওষুধ প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস বা ইডিসিএল সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ সরবরাহ করে। ইডিসিএলের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনার দাবি রাখে।
ওষুধের দাম নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে ওষুধশিল্পের বিকাশ এবং একই সঙ্গে মানুষকে ন্যায্যমূল্যে ওষুধ দেওয়ার একটা টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ; এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)