উন্নয়নের পথে হাঁটতে গিয়ে আমরা কি বেঁচে থাকার জায়গাটুকু হারাচ্ছি?
একদিন বিকেলে বৃষ্টির পর শহরের একটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। চারপাশে পানি, যানবাহনের দীর্ঘ সারি, রিকশাচালকের ভেজা শরীর, দোকানের সামনে উৎকণ্ঠিত মানুষ। একজন মধ্যবয়সী মানুষকে বলতে শুনলাম, ‘এত উন্নয়ন হচ্ছে, অথচ একটু বৃষ্টি হলেই শহরটা অচল হয়ে যায় কেন?’ প্রশ্নটি খুব সাধারণ। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের উন্নয়ন-চিন্তার একটি বড় সংকট।আমরা উন্নয়ন চাই—এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়ন, আবাসন, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, আধুনিক নগর—সবই প্রয়োজন। একটি দেশের অর্থনীতি এগোবে, মানুষের আয় বাড়বে, জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা।কিন্তু উন্নয়ন যখন মানুষের জীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক করার বদলে তাকে প্রকৃতি থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন করে, তখন প্রশ্ন তোলা জরুরি হয়ে পড়ে—আমরা উন্নয়ন করছি, নাকি ভবিষ্যতের সংকট তৈরি করছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব দূরে যেতে হয় না।বর্ষাকালে শহরের জলাবদ্ধতা আমাদের চোখের সামনে সেই উত্তর লিখে দেয়। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায়। কোথাও বাসাবাড়িতে পানি ঢোকে, কোথাও দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ যানজটে আটকে থাকে। তারপর শুরু হয় দোষারোপের পালা।কেউ বৃষ্টিকে দায়ী করেন, কেউ ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে, কেউ কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু আমরা কি কখনো নিজেদের জিজ্ঞেস করি—বৃষ্টির পানি যাওয়ার স্বাভাবিক পথগুলো আমরা কতটা অবশিষ্ট রেখেছি?একটি শহর শুধু রাস্তা আর ভবনের সমষ্টি নয়। একটি শহরেরও শ্বাস নেওয়ার জায়গা লাগে, পানি ধারণের জায়গা লাগে, পানি নিষ্কাশনের পথ লাগে, সবুজ লাগে। খাল, জলাশয়, নিচু জমি, গাছপালা—এসব শহরের সৌন্দর্যের অতিরিক্ত কিছু নয়; এগুলো শহরের টিকে থাকার অবকাঠামোর অংশ। কিন্তু উন্নয়নের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় এই মৌলিক সত্যটিই ভুলে যাই।যে খাল একসময় বর্ষার পানি বহন করত, সেটি সংকুচিত হয়। যে জলাভূমি বৃষ্টির পানি ধরে রাখত, সেটি ভরাট হয়ে যায়। যে জায়গায় গাছ ছিল, সেখানে গড়ে ওঠে নতুন স্থাপনা। তারপর অতিবৃষ্টির সময় পানি যখন বের হওয়ার পথ খুঁজে পায় না, তখন আমরা জলাবদ্ধতাকে আকস্মিক দুর্যোগ হিসেবে দেখি। অথচ এর পেছনে অনেক সময় বছরের পর বছর ধরে নেওয়া ছোট ছোট সিদ্ধান্ত কাজ করে।একটি বড় গাছ কেটে ফেলার ঘটনাটিও তেমন। গাছ কাটতে সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু একটি বড় গাছ তৈরি হতে লাগে বহু বছর। সেই সময়ের মধ্যে গাছটি শুধু বড় হয় না; সে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে, বাতাসে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে, ছায়া দেয়, পাখির আশ্রয় হয়, শহরের তাপ কমাতে ভূমিকা রাখে। তাই একটি গাছের মূল্য শুধু কাঠের দামে হিসাব করা যায় না।আমরা যখন একটি পুরোনো গাছ কেটে তার পাশে একটি চারা রোপণ করি, তখন কাগজে হয়তো দুটোই ‘গাছ’। কিন্তু প্রকৃতির হিসাবে দুটির মূল্য এক নয়। একটি চারা ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। আর একটি পরিণত গাছ বর্তমানের আশ্রয়। এ পার্থক্যটি আমাদের পরিকল্পনায় কতটা গুরুত্ব পায়?নদীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও মানুষের জীবন নদীর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নদী আমাদের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। অথচ অনেক নদী ও জলপ্রবাহ আজ দূষণ, দখল, বর্জ্য ও নানা ধরনের মানবিক হস্তক্ষেপের চাপে বিপন্ন। নদীকে আমরা অনেক সময় শুধু একটি জলধারা হিসেবে দেখি। কিন্তু একটি নদী আসলে একটি জীবন্ত ব্যবস্থা।নদীর পানি দূষিত হলে শুধু মাছ মরে না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় জেলে পরিবার, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাত্রা। নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বৃহত্তর পরিবেশ ও অর্থনীতিতেও তার প্রতিফলন ঘটে।এখানেই উন্নয়ন ও পরিবেশের সম্পর্কটি নতুন করে বোঝা প্রয়োজন। পরিবেশ রক্ষা উন্নয়নের বিপরীত কোনো ধারণা নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হলো একটি সুস্থ পরিবেশ। একটি শিল্পকারখানা তৈরি হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, অর্থনীতি সচল হয়। কিন্তু সেই শিল্পের বর্জ্য যদি নদীকে দূষিত করে, তাহলে একদিকে যে অর্থনৈতিক লাভ তৈরি হয়, অন্যদিকে তার পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতির বোঝাও তৈরি হয়।সুতরাং উন্নয়নের হিসাব শুধু নির্মাণ ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। দেখতে হবে সেই উন্নয়নের সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য কত।আমাদের পরিকল্পনায় এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কোনো রাস্তা নির্মাণের আগে যেমন এর অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা হয়, তেমনি পানি নিষ্কাশন, জলাধার সংরক্ষণ ও পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় থাকা দরকার। কোনো শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার আগে যেমন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের হিসাব করা হয়, তেমনি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর প্রভাবের হিসাবও থাকা প্রয়োজন।কোনো নগর পরিকল্পনার সময় শুধু কতটি ভবন হবে তা নয়, কতটি গাছ থাকবে, কতটুকু উন্মুক্ত স্থান থাকবে, কোথায় পানি জমবে এবং কোথা দিয়ে পানি বের হবে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকৃতির জায়গা দখল করে উন্নয়ন করলে প্রকৃতি একসময় অন্যভাবে তার জায়গা ফেরত নেয়। কখনো জলাবদ্ধতায়, কখনো তাপপ্রবাহে, কখনো নদীভাঙনে, কখনো পানির সংকটে।প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়—এ কথা বলা হয়তো বৈজ্ঞানিক ভাষা নয়। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম অমান্য করার পরিণতি যে মানুষকেই বহন করতে হয়, তার উদাহরণ আমাদের চারপাশে কম নেই। তবে এর দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়।রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বড় হলেও নাগরিকের দায়িত্বও কম নয়। আমরা অনেক সময় নিজেরাই যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক ফেলি, খালে ময়লা ফেলি, নদীর পাড়ে আবর্জনা জমাই। পরে সেই খাল বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা পানি দূষিত হলে আমরা প্রশাসনের কাছে জবাব চাই।প্রশ্নটি তাই দ্বিমুখী হওয়া দরকার। রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব পালন করছে? একই সঙ্গে নাগরিক হিসেবে আমরাও কি আমাদের দায়িত্ব পালন করছি? পরিবেশ রক্ষার লড়াই শুধু আইন দিয়ে জেতা সম্ভব নয়। দরকার সামাজিক অভ্যাসের পরিবর্তন, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। আমাদের উন্নয়নের সংজ্ঞা বদলাতে হবে।একটি নতুন সেতু নিঃসন্দেহে উন্নয়নের চিহ্ন। কিন্তু সেই সেতু দিয়ে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারছে কি না, আশপাশের পরিবেশের ওপর তার প্রভাব কী—সেটিও উন্নয়নের আলোচনায় থাকতে হবে।একটি নতুন শহর নিঃসন্দেহে অগ্রগতির প্রতীক। কিন্তু সেখানে শিশুর খেলার মাঠ আছে কি না, প্রবীণ মানুষের হাঁটার জায়গা আছে কি না, বৃষ্টির পানি ধারণের ব্যবস্থা আছে কি না—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যেখানে অর্থনীতি বাড়বে, কিন্তু নদী কমবে না শহর বড় হবে, কিন্তু গাছ ছোট হবে না। শিল্প বাড়বে, কিন্তু বাতাস ভারী হবে না। আবাসন বাড়বে, কিন্তু জলাভূমি হারিয়ে যাবে না।এটা কোনো কল্পিত আদর্শ নয়। বরং টেকসই উন্নয়নের মৌলিক দর্শনই হলো—আজকের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আগামী দিনের মানুষের অধিকার নষ্ট না করা।আমাদের সন্তানদের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি—এই প্রশ্নটি তাই এখনই করা দরকার একদিন তারা হয়তো আমাদের তৈরি করা উঁচু ভবন দেখবে। বড় সড়ক দেখবে। সেতু দেখবে। প্রযুক্তির বিস্ময় দেখবে। কিন্তু তারা যদি একই সঙ্গে জিজ্ঞেস করে, ‘নদীগুলো কোথায়? গাছগুলো কোথায়? খালগুলো কোথায়? খেলার মাঠগুলো কোথায়?’ তখন আমরা কী উত্তর দেব?আমরা হয়তো বলব—সময় বদলেছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন প্রকৃতির প্রয়োজনকে বাতিল করে না। মানুষ যত আধুনিকই হোক, তাকে শ্বাস নিতে বাতাস লাগবে। পানি পান করতে হবে। খাদ্য উৎপাদনের জন্য মাটি ও পানি লাগবে। বৃষ্টির পানি নামার পথ লাগবে। গরম থেকে বাঁচতে সবুজ লাগবে। অর্থাৎ প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির বিকল্প হতে পারে না।তাই এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়তো আরও দ্রুত নির্মাণ করা নয়; বরং কী নির্মাণ করছি এবং কী হারিয়ে নির্মাণ করছি—সেটি বোঝা। উন্নয়ন থামবে না, থামার কথাও নয়। কিন্তু উন্নয়নের সঙ্গে বিবেকেরও এগিয়ে যাওয়া দরকার।কারণ একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; সেই দেশের মানুষ কতটা নিরাপদে, সুস্থভাবে এবং মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারছে—তার মধ্যেও উন্নয়নের আসল অর্থ লুকিয়ে থাকে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে উন্নয়নের ছবি দেখে গর্ব হবে, আবার নদীর দিকে তাকিয়েও শান্তি পাওয়া যাবে।যেখানে নতুন ভবন উঠবে, কিন্তু পুরোনো গাছ অকারণে পড়বে না। যেখানে শহর বাড়বে, কিন্তু মানুষের আকাশ ছোট হবে না। যেখানে অর্থনীতি এগোবে, কিন্তু প্রকৃতি পেছনে পড়ে থাকবে না। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব কঠিন নয়।আমরা কি শুধু আগামী দিনের জন্য একটি বড় বাংলাদেশ তৈরি করতে চাই, নাকি একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশও রেখে যেতে চাই? এই সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। আজকের সিদ্ধান্তের ফল হয়তো আগামীকাল পুরোপুরি দেখা যাবে না। কিন্তু আমাদের সন্তানরা একদিন সেই ফলের মধ্যেই বাস করবে। তাই উন্নয়ন হোক—অবশ্যই হোক।কিন্তু এমন উন্নয়ন হোক, যার কাছে নদীকে ক্ষমা চাইতে হবে না, গাছকে বিদায় দিতে হবে না, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমাদের ভুলের মূল্য দিতে হবে না।লেখক: মীযানুর রহমানপ্রতিষ্ঠাতা, মহাসচিবপরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি