দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৯৫ হাজার ছাড়িয়ে মৃত্যু ২৯৫
দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও প্রাণহানি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৫১ জন। তাঁদের মধ্যে ২৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অক্টোবর মাসেও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শুক্রবার (৯ অক্টোবর) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার হিসাব তুলে ধরা হয়। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩০০ জন। একই সময়ে মারা গেছেন একজন। মৃত ব্যক্তি খুলনা বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে ডেঙ্গুতে মারা যান। অন্যদিকে, অক্টোবর মাসে এখন পর্যন্ত ৫০ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।মাসভিত্তিক এই পরিসংখ্যান ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও প্রাণহানির ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের মৃত্যুর সংখ্যা পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। তবে সংক্রমণ কমাতে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৮৯ হাজার ৩৮০ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ১৭২ জন। তবে নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা অব্যাহত থাকায় আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং গুরুতর রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা এবং নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই এসব স্থানে পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা প্রয়োজন।শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে নয়, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমও জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, নিয়মিত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করতে ধারাবাহিক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা এবং বমি বমি ভাব। এসব উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অতিরিক্ত তন্দ্রা কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। জ্বর কমে যাওয়ার সময়ও ডেঙ্গুর জটিলতা দেখা দিতে পারে, তাই সতর্ক থাকা জরুরি।ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। এসব ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করাই নিরাপদ।চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ২৯৫ জনের মৃত্যু এবং ৯৫ হাজার ৪৫১ জনের আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা বাড়ানো যথেষ্ট নয়; সংক্রমণের উৎস ধ্বংস, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, কার্যকর নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।সরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ এবং প্রাণহানি কমানো সম্ভব। এখন প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ, যাতে নতুন সংক্রমণ কমিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়।তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।