পরিবেশ কন্ঠ

সবুজায়নে ছাদবাগান নীতি

বর্তমান প্রেক্ষাপটে নগর সবুজায়নে ছাদবাগান ছাড়া বিকল্প কিছু আছে বলে মনে হয় না। কৃষি তথ্য সার্ভিস এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই আনুমানিক সাড়ে চার লাখ বহুতল ভবনের ছাদ রয়েছে, যার আয়তন প্রায় চার হাজার ৫০০ হেক্টর (প্রায় সাড়ে চার কোটি বর্গমিটার)। তবে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা শহরে প্রায় ৫০ লাখ পরিবারের বাস। এসব পরিবার মোটামুটি পাঁচ লাখ ভবনে বসবাস করে। যদি গড়ে হিসাব করা হয়, পাঁচ লাখ ভবনের ৬০ শতাংশ ছাদে বাগান করার উপযোগিতা আছে। সে ক্ষেত্রে তিন লাখ ছাদ পাওয়া যায়, যেগুলোতে বাগান করা যায়। বর্তমানে রাজধানীতে যত ছাদ আছে, এর মধ্যে বাগান রয়েছে প্রায় ৫ শতাংশে। তাই ছাদবাগান কোনো বিলাসী চিন্তা কিংবা কেবল শহরকেন্দ্রিক বিলাসিতা নয়; বরং শহর থেকে শুরু করে গ্রাম-মফস্বলের প্রতিটি নতুন ভবনের জন্যই এটি এক পরিবেশগত জরুরি প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারিভাবে ছাদবাগানকে সুরক্ষা দেওয়া, নতুন ছাদবাগান গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা এবং পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি হয়ে উঠেছে। সে জন্য প্রথমেই প্রয়োজন ছাদবাগানের একটি সুস্পষ্ট সরকারি সংজ্ঞা নির্ধারণ। ছাদে কত শতাংশ সবুজায়নের আওতায় থাকলে তা সরকারি বা সিটি করপোরেশনের খাতায় ‘ছাদবাগান’ হিসেবে সংবিধিবদ্ধ স্বীকৃতি পাবে, তার পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড থাকতে হবে। ক্ষেত্রভেদে ব্যবহারের যোগ্য ছাদের একটি নির্দিষ্ট অংশ সবুজ রাখার বাধ্যবাধকতা দেওয়া যেতে পারে। প্রতিটি ওয়ার্ড বা সিটি করপোরেশনভিত্তিক এলাকা নির্ধারণ করে সেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাদবাগান থাকার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা দরকার। একটি ওয়ার্ড বা পুরো ঢাকা শহরের কত শতাংশ বহুতল ভবনের ছাদে সবুজায়ন করা আবশ্যক, তা চিহ্নিত করে তদারকের জন্য বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। ছাদবাগান গড়ে তুলতে নাগরিকদের জন্য সরকারি ও স্থানীয় উদ্যোগে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যস্ততার মাঝে অফিস বা চাকরির পাশাপাশি কীভাবে স্বল্প পরিসরে প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাগান করা যায়, মিয়াওয়াকি কিংবা অ্যাকুয়াপোনিক্সের মতো আধুনিক কনসেপ্ট কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা সাধারণ মানুষকে শেখানো দরকার। ছাদবাগান মানেই যে মশার কারখানা বা ডেঙ্গুর বংশবৃদ্ধি কেন্দ্র– এই সামাজিক ভুল ধারণা ভাঙতে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। ভবনের কোনো ক্ষতি না করে সঠিক ওয়াটারপ্রুফিং, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদে ছাদবাগান পরিচালনার নিয়মাবলি প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বাসা ভাড়ার ক্ষেত্রে একতরফা ও অন্যায্য শর্ত আরোপের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। কোনো ভাড়া চুক্তিতে যদি লেখা থাকে ‘ছাদে বাগান করলে বাসা ভাড়া দেওয়া হবে না’ বা ‘গাছ রাখা নিষিদ্ধ’ তবে আইনি সংস্কারের মাধ্যমে ভাড়া চুক্তির এমন অন্যায্য শর্তকে সরাসরি ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ অর্থাৎ আইনগতভাবে বাতিল ও অকার্যকর ঘোষণা করতে হবে। এ জন্য নতুন আইন তৈরি ও বিদ্যমান আইনগুলোতে সংশোধনী এনে সমন্বয় করা সম্ভব। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩-এর অধীনে বিশেষ নির্দেশিকা বা প্রবিধান জারি করে ছাদবাগানের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড যুক্ত করা যায়। পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা এবং রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এ সংশোধনী এনে নতুন বহুতল ভবনে ছাদবাগান ও পরিবেশবান্ধব ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা সম্ভব। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর হোল্ডিং ট্যাক্স বিধিতে কর রেয়াতের বাধ্যবাধকতা এবং বাড়ি ভাড়া আইন, ১৯৯১-এ ভাড়াটিয়াদের ছাদ ব্যবহারের অধিকার সুরক্ষিত করা যায়। ছাদবাগানকে কেবল ব্যক্তিগত বিলাসিতা বা বিলাসী কাজ হিসেবে না দেখে নগর ব্যবস্থাপনার একটি স্বীকৃত সংবিধিবদ্ধ অংশ করতে পারলেই আমরা পাব একটি বাসযোগ্য সবুজ দেশ। জেসমিন জেবা: আইনজীবী, ঢাকা জজকোর্ট

সবুজায়নে ছাদবাগান নীতি