পরিবেশ কন্ঠ

বাংলাদেশে তিন পরাশক্তির নজর

বাংলাদেশ আজ এক সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদ বাংলাদেশকে তাদের মল্লযুদ্ধের ময়দান বানাতে চায়। ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় ওয়াশিংটন, বেইজিং ও নয়াদিল্লি–এই তিন বৃহৎ শক্তি বাংলাদেশে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের দীর্ঘ উপকূল, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথ ও ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরের নৈকট্য বাংলাদেশকে এই আঞ্চলিক গ্রেট গেম বা মহারণের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। সরকার পতন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও বিএনপির ক্ষমতারোহণ–এই দ্রুত বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে তিন শক্তির নতুন দৌড়ঝাঁপ চলছে। বিশ্বপুঁজির আন্তঃবিরোধ থেকে ওয়াশিংটনের মূল আগ্রহ হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে প্রতিহত করা, বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত প্রবেশাধিকার এবং অর্থনৈতিক-সামরিক প্রভাবক্ষমতা তৈরি করা। ইউনূস সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থবিরোধী যে বাণিজ্য চুক্তি করেছে সেটি অনুসরণ করলেই এর প্রমাণ মিলবে। চুক্তি মতে, আগামী ১৫ বছরে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য ও ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করতে হবে বাংলাদেশকে। এছাড়াও, চুক্তির ৪.১ ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তা রক্ষার্থে কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তবে বাংলাদেশকেও সেই মার্কিন পদক্ষেপের সমর্থনে সংগতিপূর্ণ বিধিনিষেধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ কেন কোনো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে দ্বন্দ্বে জড়াবে? যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে নতুন করে সামরিক চুক্তি করার চাপও রয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বেইজিংয়ের বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় কৌশলের অন্তর্ভুক্ত। তার অংশ হিসেবে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ধীরগতিতে চললেও বহাল আছে। জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে ১৫টির বেশি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনাও হয়েছে। বেইজিং চায় মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক ‍করিডোর ও বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত প্রবেশের সুযোগ। আর নয়াদিল্লির মূল উদ্বেগ নিরাপত্তাকেন্দ্রিক, বিশেষত, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা ও ২২ কিলোমিটার চওড়া শিলিগুড়ি করিডোরের সুরক্ষা। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিরোধিতা তীব্র হয়। এই সঙ্গে কূটনৈতিক প্রতিবাদ ও ভিসা স্থগিতাদেশে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ ভারতীয় সুতা (৮০%) ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদ্যুৎ আমদানি হয় ভারত থেকে।  বাংলাদেশ যেন তিন পরাশক্তির ত্রিভুজ সংঘাতের রণক্ষেত্র। ওয়াশিংটন শুল্ক-বাণিজ্য-সামরিক চুক্তিতে চীনা প্রভাব ঠেকাতে চায়, আর চীন অর্থনৈতিক সংযুক্তি ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে অবস্থান শক্ত করতে চায়। উভয়েই চায় আমাদের বঙ্গোপসাগর অংশে প্রবেশ করতে। চীন-ভারত বৈরী সম্পর্কের কারণে ভারত বাংলাদেশে চীনের যে কোনো উপস্থিতির বিরুদ্ধে। ওয়াশিংটন-দিল্লি ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে চীনকে ঘেরাও করতে চায়। এ বিষয়ে দুই দেশের স্বার্থ অনেকটা অভিন্ন। তবে পরাশক্তিগুলোর এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী দরকষাকষির সুযোগ এনে দিয়েছে। অপরদিকে, পরাশক্তিগুলোর ফাঁদে পড়ার বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশেকে কোনো দেশের প্রতি না ঝুঁকে জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলে স্থির থাকা দরকার। ঋণ-ফাঁদ এড়িয়ে চলতে হবে। পরাশক্তির সঙ্গে কোনো সামরিক চুক্তি নয়। বাংলাদেশের কৌশলগত সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দর, মাতারবাড়ী ও সেন্ট মার্টিনের ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে।   কিন্তু সরকার ও বিরোধী দল নীরব থেকে যেন বাণিজ্যচুক্তির নামে দাসখত মেনে নিয়েছে। উপরন্তু, ক্ষমতার খেলায় জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদে হইচই করলেও, জাতীয় স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তারা একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। মার্কিন প্রতিনিধিদের বাংলাদেশে আনাগোনা বেড়েছে—সরকার, জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে বৈঠক করছেন।  বাংলাদেশে বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো, নাগরিক মঞ্চ, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি এবং কিছু গবেষক এই চুক্তির বিরোধিতা করছেন। বামপন্থিরা স্পষ্টভাবে সরকারকে চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানিয়ে একে অসম ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে চিহ্নিত করেছেন। এই খেলায় পড়ে সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে। যুদ্ধবিমান, ড্রোন কেনার পেছনে ছুটছে। এতে করে দেশের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষ অর্জিত সাফল্যের হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দেশের টাকা পয়সা দিয়ে অস্ত্র, মিসাইল, যুদ্ধবিমান না কিনে সেটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশুদের উন্নতি ও বয়স্কদের সেবায় ব্যয় করতে চাই। আমাদের হানাহানির পথ পরিহার করে বিশ্বপুঁজির আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার নতুন রাজনীতি নির্মাণ করতে হবে।  ড. আখতার সোবহান মাসরুর: লেখক ও গবেষক  

বাংলাদেশে তিন পরাশক্তির নজর