ইটনা শাহি মসজিদ: হাওরের বুকে ৫০০ বছরের মোগল স্থাপত্যের নীরব সাক্ষী
হাওরাঞ্চলের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী দাঁড়িয়ে আছে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলা-এর ঐতিহাসিক ইটনা শাহি মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে এটি বেশি পরিচিত ‘গায়েবি মসজিদ’ নামে। বিস্তীর্ণ হাওর, জলরাশি আর নৌপথঘেরা জনপদের মাঝখানে অবস্থিত এই প্রাচীন স্থাপনাটি শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং বাংলার প্রাচীন ইতিহাস, স্থাপত্য ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।ইটনা শাহি মসজিদ অবস্থিত উপজেলার সদর ইউনিয়নের বড়হাটি এলাকায়। বর্ষা মৌসুমে নৌকাই এখানে পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম, আর শুষ্ক মৌসুমে সড়কপথ ব্যবহার করা যায়। বছরের বিভিন্ন সময় দেশ-বিদেশের পর্যটক, গবেষক ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে ছুটে আসেন।ইতিহাসবিদদের মতে, মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। কারণ এখানে কোনো নির্ভুল শিলালিপি বা লিখিত দলিল নেই। তবে স্থানীয় জনশ্রুতি বলছে, প্রায় ৫০০ বছর আগে বারো ভূঁইয়ার অন্যতম প্রধান নেতা ঈসা খাঁ-এর সভাসদ মজলিশ দেলোয়ার এই মসজিদ নির্মাণ করেন। সে সময় ইটনা অঞ্চল ছিল প্রশাসনিক ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। ধারণা করা হয়, হাওরাঞ্চলে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যই এই এলাকায় এমন দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল।১৯৯৪ সালে পরিচালিত এক ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষায় জানা যায়, মসজিদটির বয়স প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বছরের মধ্যে হতে পারে। গবেষকদের ধারণা, এটি সুলতানি আমলের শেষভাগ এবং মোগল আমলের শুরুর দিকের স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য সংমিশ্রণ বহন করে।স্থাপত্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মসজিদটি একটি উঁচু বেদির ওপর নির্মিত। চারপাশে রয়েছে শক্ত ও মোটা দেয়াল, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সময়ের ক্ষয় থেকে স্থাপনাটিকে অনেকাংশে রক্ষা করেছে। মসজিদের দেয়ালগুলো অত্যন্ত পুরু হওয়ায় গ্রীষ্মের তীব্র গরমেও ভেতরের পরিবেশ শীতল থাকে।মসজিদের অন্যতম আকর্ষণ এর কারুকার্যময় প্রবেশদ্বার ও তোরণ। মূল ফটক এবং বিভিন্ন প্রবেশপথে পবিত্র কোরআনের আয়াত ও হাদিসের বাণী খোদাই করা রয়েছে, যা সাধারণ মোগল স্থাপত্যে খুব বেশি দেখা যায় না। এই ক্যালিগ্রাফিগুলো স্থাপনাটিকে আরও ব্যতিক্রমী করেছে।স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মসজিদটির নকশা এতটাই উন্নত ছিল যে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ছাড়াই পর্যাপ্ত আলো প্রবেশ করে। বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাও অত্যন্ত কার্যকর। ফলে আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই বহু শত বছর আগে নির্মিত এই স্থাপনাটি প্রকৌশল দক্ষতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে।মসজিদের পাথরের কাজ এবং দেয়ালের অলংকরণ এখনো অনেকটাই অক্ষত রয়েছে। যদিও সময়ের সঙ্গে কয়েক দফা সংস্কার কাজ হয়েছে, তবে ইতিহাসবিদদের মতে অতিরিক্ত সংস্কারের ফলে কিছু প্রাচীন নকশা ও কারুকার্য আড়ালে চলে গেছে। তবুও প্রবেশদ্বার, গম্বুজ এবং তোরণগুলো এখনো অতীতের গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, “আমাদের জন্য এই মসজিদ গর্বের বিষয়। এটি শুধু নামাজের জায়গা নয়, এটি আমাদের ইতিহাসের অংশ।”আরেক দর্শনার্থী জানান, “হাওরের মাঝে এমন ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখে সত্যিই বিস্মিত হয়েছি। এটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে।”প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন। বিশেষ করে জুমার দিন এবং ধর্মীয় উৎসবগুলোতে মুসল্লিদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। বর্ষাকালে হাওরের পানির ওপর নৌকায় ভেসে মসজিদে যাওয়ার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রচারের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে আরও গুরুত্ব পেতে পারে। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে ইটনা শাহি মসজিদ বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
হাওরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত বছরের পুরোনো এই মসজিদ আজও জানান দেয়—ইতিহাস কখনো হারিয়ে যায় না, যদি তাকে সংরক্ষণ করা হয় ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে।