ধ্বংসের পথে দুইশ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক প্রতাপপুর জমিদারবাড়ি
অযত্ন আর অবহেলায় শ্রীহীন হয়ে পড়ছে দুই শতকের প্রাচীন এই স্থাপনা; নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে বিপাকে দর্শনার্থীরা।ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার পূর্ব চন্দ্রপুর মডেল ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক প্রতাপপুর জমিদারবাড়িটি বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। প্রায় দুইশ বছরের প্রাচীন এই নিদর্শনটি সংস্কারের অভাবে ক্রমশ তার জৌলুস ও ঐতিহ্য হারিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে চলেছে। এক সময় যে অট্টালিকাটি ছিল অত্র অঞ্চলের আভিজাত্যের প্রতীক, আজ তা জরাজীর্ণ অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। বাংলা ১২২৮ সালের ১৩ ফাল্গুন রামনাথ কৃষ্ণ সাহা প্রায় সাড়ে ১৩ একর জায়গাজুড়ে এই বিশাল প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন। স্থানীয়ভাবে এটি ‘বড়বাড়ি’ বা ‘রাজবাড়ি’ নামে পরিচিত হলেও, এর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার বহুকাল পরেও ২০০২ সাল পর্যন্ত এখানে জমিদারের বংশধররা বসবাস করতেন। কিন্তু বর্তমানে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়ির দেয়ালগুলো খসে পড়ছে, জন্মেছে পরজীবী গাছ ও শ্যাওলা। প্রতাপপুর জমিদারবাড়ির স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। পাঁচটি সুউচ্চ দ্বিতল ভবন এবং বারোটি পুকুরবেষ্টিত এই চত্বরটি একসময় প্রাণচঞ্চল ছিল। প্রতিটি পুকুরে ছিল দৃষ্টিনন্দন ঘাটলা, যেখানে জমিদারের সদস্যরা সময় কাটাতেন। বর্তমানে সেই পুকুরগুলোর সৌন্দর্য বিলীন হয়েছে এবং ভবনগুলো মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য পর্যটক এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি দেখতে ভিড় করেন। কিন্তু পর্যটনবান্ধব পরিবেশের অভাবে তাদের পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি। এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, নেই পর্যাপ্ত শৌচাগার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে সন্ধ্যার আগেই দর্শনার্থীদের এলাকা ত্যাগ করতে হয়। পর্যটকদের মতে, পানাম সিটির মতো এই প্রতাপপুর জমিদারবাড়িকেও সরকারিভাবে সংস্কার করা হলে এটি দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ভবনগুলোর ছাদ অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকলেও রোমাঞ্চপ্রিয় দর্শনার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জরাজীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠেন। এ বিষয়ে দাগনভূঞা উপজেলা প্রশাসন জানায়, জায়গাটি ব্যক্তিমালিকানাধীন হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি পদক্ষেপ নেয়া কঠিন। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর ও জমিদারবাড়ির উত্তরসূরিদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন জেলা প্রশাসন। ফেনীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে এই জনপদকে সমৃদ্ধ করতে তারা আন্তরিকভাবে কাজ করবেন। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রতাপপুর জমিদারবাড়ি শুধু একটি ভবন নয়, এটি ফেনীর জনপদ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে রক্ষা করা না গেলে আগামী প্রজন্ম গৌরবময় এক ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হবে। পরি-কন্ঠ/মুয়াজ