বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে হামের রোগীর শরীরে মিলছে নতুন জটিলতা; স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবহেলায় বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি।
রাজধানীর মধ্য বাড্ডা থেকে আট মাসের শিশু রওজাতুল জিকরাকে নিয়ে যখন তার মা মাসুমা আক্তার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে পৌঁছান, তখন শিশুটি তীব্র জ্বরে কাঁপছিল। হামে আক্রান্ত এই শিশুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি দেখে চিকিৎসকেরা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। রওজাতুলের মতো অসংখ্য শিশু এখন কেবল হাম নয়, বরং এর সাথে যোগ হওয়া এডিনো ভাইরাসের মরণঘাতী সংক্রমণের শিকার হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, হাম ও এডিনো ভাইরাসের এই সহ-অবস্থান শিশুদের ফুসফুসকে অকেজো করে দিচ্ছে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘হোয়াইট লাং’ বা সাদা ফুসফুস বলা হয়।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, অনেক শিশু সাধারণ হামের চিকিৎসায় সুস্থ হচ্ছে না দেখে তারা ‘রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্ট’ শুরু করেন। এ পর্যন্ত ৩৫ জন হাম আক্রান্ত শিশুর নমুনা পরীক্ষা করে ১৬ জনের শরীরেই এডিনো ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এই যৌথ সংক্রমণ শিশুদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ বিস্ময়কর বিষয় হলো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই ভয়াবহতা সম্পর্কে এখনো অন্ধকারে থাকার দাবি করছে। গত ২৩ জুন এ নিয়ে বৈঠক হলেও অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে সমন্বয়হীনতার ছাপ স্পষ্ট।
আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) ইতিমধ্যে বাংলাদেশে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে। সিডিসি আটলান্টা এই সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতার আগ্রহ দেখালেও খোদ দেশের স্বাস্থ্য প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ এই সংক্রমণের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে দাবি করেছেন, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চরমভাবে হতাশ করেছে।
বিগত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ বছর এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৪৪ জনের, যার বড় একটি অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। মার্চের প্রাদুর্ভাবের পর সরকার তড়িঘড়ি করে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও তাতে ব্যাপক ঘাটতি ছিল। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুর, অথচ পরে জানা যায় প্রকৃত শিশুর সংখ্যা ২ কোটি ২৬ লাখ। অর্থাৎ প্রায় ৪৬ লাখ শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে শিশুদের।
বিশেষজ্ঞ ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে করেন, এই জরুরি অবস্থায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমন উদাসীনতা মেনে নেওয়া কঠিন। যেখানে নতুন ভাইরাস ও সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সরকারি পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রতিদিন গড়ে হাজারেরও বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছে, যা একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পরি-কন্ঠ/মুয়াজ

সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে হামের রোগীর শরীরে মিলছে নতুন জটিলতা; স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবহেলায় বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি।
রাজধানীর মধ্য বাড্ডা থেকে আট মাসের শিশু রওজাতুল জিকরাকে নিয়ে যখন তার মা মাসুমা আক্তার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে পৌঁছান, তখন শিশুটি তীব্র জ্বরে কাঁপছিল। হামে আক্রান্ত এই শিশুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি দেখে চিকিৎসকেরা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। রওজাতুলের মতো অসংখ্য শিশু এখন কেবল হাম নয়, বরং এর সাথে যোগ হওয়া এডিনো ভাইরাসের মরণঘাতী সংক্রমণের শিকার হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, হাম ও এডিনো ভাইরাসের এই সহ-অবস্থান শিশুদের ফুসফুসকে অকেজো করে দিচ্ছে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘হোয়াইট লাং’ বা সাদা ফুসফুস বলা হয়।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, অনেক শিশু সাধারণ হামের চিকিৎসায় সুস্থ হচ্ছে না দেখে তারা ‘রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্ট’ শুরু করেন। এ পর্যন্ত ৩৫ জন হাম আক্রান্ত শিশুর নমুনা পরীক্ষা করে ১৬ জনের শরীরেই এডিনো ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এই যৌথ সংক্রমণ শিশুদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ বিস্ময়কর বিষয় হলো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই ভয়াবহতা সম্পর্কে এখনো অন্ধকারে থাকার দাবি করছে। গত ২৩ জুন এ নিয়ে বৈঠক হলেও অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে সমন্বয়হীনতার ছাপ স্পষ্ট।
আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) ইতিমধ্যে বাংলাদেশে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে। সিডিসি আটলান্টা এই সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতার আগ্রহ দেখালেও খোদ দেশের স্বাস্থ্য প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ এই সংক্রমণের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে দাবি করেছেন, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চরমভাবে হতাশ করেছে।
বিগত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ বছর এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৪৪ জনের, যার বড় একটি অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। মার্চের প্রাদুর্ভাবের পর সরকার তড়িঘড়ি করে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও তাতে ব্যাপক ঘাটতি ছিল। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুর, অথচ পরে জানা যায় প্রকৃত শিশুর সংখ্যা ২ কোটি ২৬ লাখ। অর্থাৎ প্রায় ৪৬ লাখ শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে শিশুদের।
বিশেষজ্ঞ ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে করেন, এই জরুরি অবস্থায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমন উদাসীনতা মেনে নেওয়া কঠিন। যেখানে নতুন ভাইরাস ও সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সরকারি পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রতিদিন গড়ে হাজারেরও বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছে, যা একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পরি-কন্ঠ/মুয়াজ

আপনার মতামত লিখুন