প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মেলবন্ধন থাকলেও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থায় থমকে আছে তাহিরপুরের পর্যটন সম্ভাবনা।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা যাদুকাটা নদী আর বারেকের টিলা যেন প্রকৃতির নিপুণ হাতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা এই নদীটির রূপ যেন ঋতুভেদে বদলায়, কিন্তু তার আকর্ষণ কখনো কমে না। একদিকে গগনচুম্বী সবুজ পাহাড়, অন্যদিকে নদীর বুকে স্বচ্ছ নীলাভ জলরাশি আর ধূসর বালুচর—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের হাতছানি। স্থানীয়দের কাছে 'বড়গুপ টিলা' নামে পরিচিত বারেকের টিলার চূড়ায় দাঁড়ালে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর দুই ধারের ঘন সবুজের সমারোহ পর্যটকদের মনে করিয়ে দেয় কোনো এক রূপকথার রাজ্যকে।
এ অঞ্চলের সৌন্দর্য কেবল প্রকৃতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক মিলনস্থল। বারেকের টিলায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জুম চাষ, তাদের নিজস্ব জীবনধারা, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং ঐতিহ্যবাহী উৎসব পর্যটকদের দেয় এক ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা। এর পাশাপাশি আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় চেতনার প্রসারেও এ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম সঙ্গী হজরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর আস্তানা থেকে শুরু করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুণ্যভূমি পনাতীর্থ ও শ্রী শ্রী অদ্বৈত প্রভুর মন্দির—সবই এ অঞ্চলকে দিয়েছে অনন্য এক মর্যাদা। ইস্কন মন্দির ও গরমপীরের মাজারের উপস্থিতি এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
তবে এত বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, অবহেলিত অবকাঠামো আর অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে এই পর্যটন স্বর্গটি তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। পর্যটকদের অভিযোগ, টাঙ্গুয়ার হাওর কিংবা যাদুকাটার মতো বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানোর রাস্তাগুলো অত্যন্ত জীর্ণ। এছাড়া বারেকের টিলায় বা এর আশেপাশে রাত্রিযাপনের জন্য কোনো উন্নত মানের সরকারি বা বেসরকারি আবাসন ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় বাদাঘাট ও উত্তর বড়দল ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা গেলে এই অঞ্চলটি দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তারা জানান, সারা বছরই এখানে পর্যটকদের আনাগোনা থাকে, কিন্তু আবাসন সংকটে তাদের অনেক কষ্ট পোহাতে হয়।
পরিশেষে বলা যায়, যাদুকাটা ও বারেকের টিলার এই নৈসর্গিক রূপকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা। পার্শ্ববর্তী ট্যাকের ঘাট চুনাপাথর প্রকল্প ও রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পর্যটন বলয় গড়ে তোলা সম্ভব। পাহাড়, নদী আর অরণ্যের এই মিতালি যদি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচার পায়, তবে তা কেবল স্থানীয় নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও এক বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পরি-কন্ঠ/মুয়াজ

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মেলবন্ধন থাকলেও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থায় থমকে আছে তাহিরপুরের পর্যটন সম্ভাবনা।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা যাদুকাটা নদী আর বারেকের টিলা যেন প্রকৃতির নিপুণ হাতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা এই নদীটির রূপ যেন ঋতুভেদে বদলায়, কিন্তু তার আকর্ষণ কখনো কমে না। একদিকে গগনচুম্বী সবুজ পাহাড়, অন্যদিকে নদীর বুকে স্বচ্ছ নীলাভ জলরাশি আর ধূসর বালুচর—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের হাতছানি। স্থানীয়দের কাছে 'বড়গুপ টিলা' নামে পরিচিত বারেকের টিলার চূড়ায় দাঁড়ালে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর দুই ধারের ঘন সবুজের সমারোহ পর্যটকদের মনে করিয়ে দেয় কোনো এক রূপকথার রাজ্যকে।
এ অঞ্চলের সৌন্দর্য কেবল প্রকৃতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক মিলনস্থল। বারেকের টিলায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জুম চাষ, তাদের নিজস্ব জীবনধারা, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং ঐতিহ্যবাহী উৎসব পর্যটকদের দেয় এক ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা। এর পাশাপাশি আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় চেতনার প্রসারেও এ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম সঙ্গী হজরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর আস্তানা থেকে শুরু করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুণ্যভূমি পনাতীর্থ ও শ্রী শ্রী অদ্বৈত প্রভুর মন্দির—সবই এ অঞ্চলকে দিয়েছে অনন্য এক মর্যাদা। ইস্কন মন্দির ও গরমপীরের মাজারের উপস্থিতি এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
তবে এত বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, অবহেলিত অবকাঠামো আর অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে এই পর্যটন স্বর্গটি তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। পর্যটকদের অভিযোগ, টাঙ্গুয়ার হাওর কিংবা যাদুকাটার মতো বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানোর রাস্তাগুলো অত্যন্ত জীর্ণ। এছাড়া বারেকের টিলায় বা এর আশেপাশে রাত্রিযাপনের জন্য কোনো উন্নত মানের সরকারি বা বেসরকারি আবাসন ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় বাদাঘাট ও উত্তর বড়দল ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা গেলে এই অঞ্চলটি দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তারা জানান, সারা বছরই এখানে পর্যটকদের আনাগোনা থাকে, কিন্তু আবাসন সংকটে তাদের অনেক কষ্ট পোহাতে হয়।
পরিশেষে বলা যায়, যাদুকাটা ও বারেকের টিলার এই নৈসর্গিক রূপকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা। পার্শ্ববর্তী ট্যাকের ঘাট চুনাপাথর প্রকল্প ও রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পর্যটন বলয় গড়ে তোলা সম্ভব। পাহাড়, নদী আর অরণ্যের এই মিতালি যদি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচার পায়, তবে তা কেবল স্থানীয় নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও এক বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পরি-কন্ঠ/মুয়াজ

আপনার মতামত লিখুন