পরিবেশ কন্ঠ

মীযানুর রহমান

মীযানুর রহমান

প্রকাশক


বাংলাদেশের জলবায়ু সংকট ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি

ঢাকা, ৩ জুন ২০২৬: বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত এবং উদ্বেগের বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change)। শিল্পায়নের নামে উন্নত দেশগুলোর অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের মাসুল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও উপকূলীয় দেশগুলোকে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণের মতো মারাত্মক পরিবেশগত সংকট আজ আমাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে (COP) প্রতি বছর নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, বাস্তবায়ন কতটুকু হচ্ছে—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।এই প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে বদলে দিচ্ছে এবং এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু।১. বৈশ্বিক উষ্ণতা ও বাংলাদেশের ঋতু পরিবর্তনগ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা (Global Warming) বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ষড়ঋতুর ওপর। এখন আর আগের মতো নির্দিষ্ট সময়ে বর্ষা আসে না, আবার যখন আসে তখন রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত বা আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, তীব্র তাপদাহ বা 'হিট ওয়েভ' এখন দেশের নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চৈত্র-বৈশাখ মাসের তীব্র গরম এখন বর্ষা বা শরৎকালেও অনুভূত হচ্ছে, যা কৃষি খাতের জন্য একটি বড় বিপর্যয়।২. কার্বন নিঃসরণ: অপরাধী বনাম ভুক্তভোগীজলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ (Carbon Emission)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো বিশ্বের সিংহভাগ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। অথচ, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ১ শতাংশেরও কম (প্রায় ০.৪০%)। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ করেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।৩. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলের কান্নাহিমবাহ গলে যাওয়া এবং সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি (Sea Level Rise) পাচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের পানির স্তর যদি আর মাত্র ১ মিটার বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে।ইতিমধ্যে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মতো উপকূলীয় জেলাগুলোতে লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে প্রবেশ করেছে। সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে শহরে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে, যাদের আমরা বলছি ‘জলবায়ু শরণার্থী’ (Climate Refugees)।বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকির প্রধান ৩টি সূচক: গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি (হিট ওয়েভ ও খরা) সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি (লবণাক্ততা ও জমি হ্রাস) চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া (ঘন ঘন সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস)৪. আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন (COP) এবং প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাবজাতিসংঘের বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলন বা COP (Conference of the Parties)-এ প্রতি বছরই বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পক্ষে জোরালো আওয়াজ তোলে। উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ' (Loss and Damage) ফান্ড বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবি জানানো হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বড় বড় সম্মেলনগুলোতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বা আর্থিক সহায়তার যে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, ফান্ড রিলিজের সময় তার খুব কমই আলোর মুখ দেখে। আন্তর্জাতিক এই কূটনীতিতে বাংলাদেশকে আরও শক্ত অবস্থানে যেতে হবে।৫. কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় বড় আঘাতবাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কিন্তু জলবায়ুর এই খামখেয়ালী আচরণের কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। হঠাৎ বন্যা, খরা কিংবা অসময়ের বৃষ্টিতে আমন বা বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে সাধারণ ধান চাষ অসম্ভব হয়ে পড়ছে। যদি দ্রুত জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ না করা যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে খাদ্য সংকট তীব্র রূপ নিতে পারে।আমাদের করণীয়: টেকসই সমাধানের পথজলবায়ু পরিবর্তন পুরোপুরি রোধ করা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে এর প্রভাব মোকাবিলা বা অভিযোজন (Adaptation) করা সম্ভব।নবায়নযোগ্য জ্বালানি: আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল) নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের মতো সবুজ শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।প্রাকৃতিক ঢাল রক্ষা: সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। উপকূলীয় বনায়ন এবং সুন্দরবন রক্ষার মাধ্যমে সাইক্লোন বা জলোচ্ছ্বাসের গতি কমিয়ে আনা সম্ভব।নদী ড্রেজিং ও পানি ব্যবস্থাপনা: দেশের নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে, যেন বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি সহজে নেমে যেতে পারে এবং আকস্মিক বন্যা এড়ানো যায়।উপসংহারজলবায়ু পরিবর্তন আর কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যৎ নয়, এটি আমাদের বর্তমানের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক সহায়তার আশায় বসে না থেকে বাংলাদেশকে নিজস্ব অর্থায়নে এবং টেকসই প্রযুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী 'ডেল্টা প্ল্যান' বা বদ্বীপ পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের জলবায়ু সংকট ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি