গ্যাসের অভাবে দেশের শিল্পকারখানা বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাহিদার অর্ধেক গ্যাসও মিলছে না। এতে সক্ষমতার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কম উৎপাদন হচ্ছে কারখানায়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্প বাঁচাতে সঠিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। গত ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার সমকাল আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতে সংকট: উত্তরণে করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে এমন পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। এতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়
জ্বালানি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের বিল পরিশোধের বিষয়টি উদারভাবে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্লক অ্যাকাউন্টে নিয়ে পরে কিস্তিতে পরিশোধ করতে পারে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১৪ বছরের সমস্যা বর্তমান সরকারের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা না করে এলএনজি আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছে দেশকে। তবে সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বাপেক্সকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা ও সমন্বয় করা হচ্ছে। অতীতে গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা করা হয়েছিল এবং বাপেক্সকে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছিল। বর্তমানে বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে নতুন রিগ কেনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পর্যাপ্ত খনি অনুসন্ধান না হওয়ায় দেশ বর্তমানে গ্যাস আমদানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া একটি এফএসআরইউ টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ফলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় দ্রুততম সময়ে একটি চীনা কোম্পানিকে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া তৃতীয় এফএসআরইউর সঙ্গে সমন্বয় করে বাখরাবাদ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। দেশের জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি শিল্প খাতের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
মাহবুবুর রহমান সভাপতি, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি)
বর্তমানে একটি বিতর্ক চলছে–গ্যাস কোথায় অগ্রাধিকার পাবে। গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রে যাবে, শিল্পে যাবে, নাকি সার কারখানায়। তিন সেক্টরেই যেতে হবে। কারণ সবগুলোই দরকারি এবং একটির সঙ্গে অন্যটি যুক্ত। শিল্পে গ্যাস না দিলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। অথচ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নতুন কোনো শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না। শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি দেওয়া না হলে শিল্পমালিকরা ব্যাংকের ঋণের কিস্তি শোধ করতে পারবেন না। ফলে দেশে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমবে। এলএনজি আমদানির জন্য স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে গ্যাস কেনা সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার বলছে, দেশে বিনিয়োগ আসুক। যেখানে অফিসিয়ালি বলা হচ্ছে, নতুন কোনো গ্যাস সংযোগ দেওয়া যাবে না সেখানে কীভাবে বিনিয়োগ আসবে। আমরা দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরে জলে-স্থলে কোথাও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করিনি। এখন নির্বাচিত কিছু জায়গায় হচ্ছে। যেমন ভোলায়। সেখানে গ্যাস শনাক্ত হয়েছে ২০১৮ সালে, আজকে ২০২৬ সাল। এখন পর্যন্ত সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সেখানকার গ্যাস পাইপে করে নিয়ে আসতে পারবে কিনা। দুর্ভাগ্যজনক হলো–এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত এবং এর বাস্তবায়ন খুবই ধীরগতিতে চলছে। নবায়নযোগ্য শক্তি– যেমন সোলার এনার্জি যার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে আমরা সহজেই বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারি। সুশাসন নিশ্চিত না করে এবং স্টেকহোল্ডারদের পাশ কাটিয়ে কেবল আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে জ্বালানি সংকট কাটানো সম্ভব নয়। বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
জালাল আহমেদ চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন
আমাদের পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ খাতের মতো জ্বালানি খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিগত ১৫ বছরের বাজেটে কোনো কোনো বছরের বিদ্যুৎ খাতের বাজেট জ্বালানি খাতের চেয়ে ২০ গুণ বেশি ছিল। আমাদের এনার্জি পলিসিতে রয়েছে, প্রতি বছর অন্তত চারটা কূপ খনন করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা কোনো কোনো বছর একটা কূপও খনন করিনি। আমরা যদি যথেষ্ট অনুসন্ধান করতাম বিশেষ করে সিসমিক জরিপ, তাহলে গ্যাস আছে কিনা তা জানতে পারতাম। আমাদের আগ্রাসী অনুসন্ধান চালাতে হবে, স্থলে ও জলে। আমরা সমুদ্র বিজয় করেছি কিন্তু সমুদ্রের ভেতর কী আছে জানি না। এবারের বাজেটেও ড্রিলিংয়ের জন্য যথেষ্ট বাজেট নেই। ড্রিলিংয়ের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি দরকার নেই। এখানে উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের দেশীয় গ্যাসের প্রধান উৎস বিবিয়ানার উৎপাদন যে হারে কমছে, তা আশঙ্কাজনক। বিবিয়ানা থেকে অতিরিক্ত গ্যাস তুলে ফেলছি, যার ফলে ২০ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এখন আমাদের বড় আশা ‘তিতাস ডিপ ড্রিলিং’। ৬০০০ মিটার গভীরে যদি আমরা ভালো কোনো স্তর পাই, তবেই এটি জাতীয় গ্রিডে বড় সাপোর্ট দিতে পারবে। অন্যথায় শুধু ছোটোখাটো কূপ খনন করে বিশাল ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়। এক কিলোমিটার মাটির নিচ থেকে কয়লা উত্তোলন করতে যে প্রযুক্তি এবং ব্যয় সেটি আমাদের জন্য আসলে পোষাবে না। এক কিলোমিটার নিচের কয়লাকে মিথেন গ্যাস করে আনা যায়। ভোলার গ্যাস নিয়ে পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই গ্যাস দ্রুততম সময়ে ঢাকা এবং বরিশাল অঞ্চলে আনা জরুরি। পদ্মা সেতুর ওপর পাইপলাইন সুবিধা থাকায় ভোলা-বরিশাল লাইনটি সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি।
মাহমুদুর রহমান মান্না সভাপতি, নাগরিক ঐক্য
দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের যে সংকট, তা মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে। পত্রিকায় দেখা গেল, সহসাই এ কারিগরি ত্রুটির সমাধান হয়ে যাবে। তবে এ স্বাভাবিক হওয়া আদৌ স্বাভাবিক নয়। আমদানি করা এলএনজি স্বাভাবিক গ্যাসে পরিণত করে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ে ১৫-২০ টাকা। আবার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করলে বিদ্যুতের দাম পড়ে ২০-২৫ টাকা। এ টাকা জনগণের পকেট থেকে যায়। ভর্তুকি সামাল দিতে সরকার প্রায়ই বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। সরকার সমস্যার মূলে দৃষ্টি দিচ্ছে না। আমাদের গভীর সমুদ্রে যে বিপুল পরিমাণ গ্যাস আছে, তা উত্তোলনে আন্তরিক মনোযোগ নেই। সম্প্রতি গভীর সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলনে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যতদূর জেনেছি, দরপত্রে প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্টে (পিএসসি) গ্যাস রপ্তানির বিধান রাখা হচ্ছে। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দেশবাসী জানে না, সংসদে আলোচনা হচ্ছে না। এটা কাম্য নয়। জনস্বার্থ, দেশের স্বার্থ রক্ষা করে গ্যাস উত্তোলনের চুক্তি করা উচিত। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে হইচই ফেলে দিয়েছে। আমার জানা মতে, বর্তমান সৌরবিদ্যুৎ নীতিমালায় সরকার বিনিয়োগকারীর সঙ্গে শুধু বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি করবে। অর্থাৎ নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট। বিদ্যুৎ কেনা, না কেনা সরকারের মর্জির ওপর থাকবে। বিদ্যুৎ বিক্রির নিশ্চয়তা না পেলে কোনো বিনিয়োগকারী সৌরবিদ্যুতে আগ্রহী হবেন না। সরকারকে নীতিমালা সংশোধন করে বিনিয়োগকারীর সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা এবং বিদ্যুৎ বিক্রির নিশ্চয়তা দিতে হবে। কারণ দেশের মানুষকে স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ দিতে হবে।
মীর নাসির হোসেন সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই
জ্বালানি খাতে সমন্বয় নেই। আজকে আমরা গ্যাস পাচ্ছি না। গত দুই মাসে আমার কারখানা ৫২ শতাংশ কম গ্যাস পেয়েছে। এতে উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কিন্তু আমাদের ব্যয় কমেনি। ব্যাংক ঋণের সুদ দিতে হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য ঢাকঢোল পেটানো হচ্ছে অথচ স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধা না পেয়ে বিপদে আছেন। সার কারখানায় গ্যাস না দিয়ে তা যদি টেক্সটাইল বা অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পে দেওয়া যায়, তবে অর্থনীতির জন্য তা বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। সিস্টেম লসের নামে চুরি চলছে। যে জোনে গ্যাস চুরি হচ্ছে সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি কেন করা হচ্ছে না? আজকে গ্যাসের লাইন কাটা হয়, কালকে আবার সেটি পুনঃসংযোগ হয়। গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে বাসাবাড়ি নাকি শিল্পে অগ্রাধিকার দেবে–সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাসাবাড়িতে কেন লাইনের গ্যাস অব্যাহত রাখা হচ্ছে? এসব বিষয় ভালোভাবে দেখা না হলে গ্যাস সংকট থেকে আমরা বের হতে পারবো না। সোলার প্লান্ট করতে গেলে প্রচুর জায়গার দরকার। জায়গা আছে এবং সরকারকেই সেভাবে বরাদ্দ করে দিতে হবে। জায়গা সরকারের কাছ থেকে নেওয়া খুব কঠিন আর ব্যাটারির ব্যাকআপের খরচ কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যয়বহুল।
মোহাম্মদ হাতেম সভাপতি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)
গ্যাস সরবরাহ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় শিল্প খাতে এক ভয়াবহ মানবিক ও আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস নেই। আগামী ১০ আগস্টের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে প্রায় ২৫ দিন কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যত বন্ধ থাকবে। এর ফলে আমরা নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্য পাঠাতে পারব না। ক্রেতাকে সন্তুষ্ট রাখতে বিশাল অঙ্কের খরচ দিয়ে এয়ার শিপমেন্ট করতে হবে। অন্যথায় ক্রেতারা অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ডিসকাউন্ট চাইবে। পাম্প থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস নিয়ে আমরা টিকে থাকার চেষ্টা করছিলাম। এটার জন্য যেখানে তিতাসের অনুতপ্ত হওয়া দরকার, উল্টো তারা চিঠি দিয়ে বাধা দেওয়া হয়েছে। অনুরোধ করব, তিতাস যাতে এ তৎপরতা থেকে বিরত থাকে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, মাসের শুরুতে শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে। উৎপাদন না হলে বেতন পরিশোধ কঠিন হবে। বেতন ঠিকমতো না দিতে পারলে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে। ব্যাংকের ঋণের কিস্তি দিতে না পারলে আমাদের খেলাপি ঘোষণা করা হবে। যদি ঋণ শেষ পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয় তাহলে কারখানার সব কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এ অবস্থায় সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থমন্ত্রী, জ্বালানিমন্ত্রী এবং বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই বিশেষ পরিস্থিতিতে শিল্প মালিকদের প্রতি সহনশীল হয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ কোনো সমাধান দেওয়ার অনুরোধ করব। তা নাহলে শিল্প ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়বে।
আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ সাবেক সভাপতি বিজিএমইএ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইভিন্স গ্রুপ
জ্বালানির সংকটময় পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে দুই ধরনের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া। গত কয়েক সপ্তাহের তীব্র সংকটময় পরিস্থিতি শিল্প উৎপাদন যেখানে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, সেখানে গ্যাস সরবরাহ রেশনিং করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পকারখানায় যতটা সম্ভব সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা। প্রয়োজনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গ্যাস এনেও শিল্পে দিতে হবে। কারণ, শিল্পকারখানা বন্ধ থাকলে তার বহুমুখী অভিঘাত আসে অর্থনীততে। রপ্তানি আয় কমবে। বেকার হবে শ্রমিক। এমনিতেই দেশে পণ্য ও সেবা বেশি দামে কিনতে হয় অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার অস্বাভাবিক বেশি। তো সেখানে এ রকম একটা পরিস্থিতির পরিণতিটা আমাদের সবাইকে আগে থেকেই অনুমান করতে হবে। এ ছাড়া গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে যে সিস্টেম লস আছে সেটা শূন্য হারে নামিয়ে আনতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা হিসেবে কয়লাভিত্তিক গ্যাস উৎপাদনে যেতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তিতে কয়লাকে গ্যাসে রূপান্তরের যত সব প্রক্রিয়া রয়েছে সেসব প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া। কারণ গ্যাসের সংকটের স্বল্প মেয়াদের পরিকল্পনা দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা সমাধান করা যাবে না। অর্থাৎ গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতেই সেটা যেভাবেই হোক না কেন। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে, শিল্প উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার মতো গ্যাস আমরা পাচ্ছি না। জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার চেষ্টা করছে। আমরাও চাই সরকারকে সহযোগিতা করতে; যেখানে আমাদের পক্ষে সম্ভব।
শওকত আজিজ রাসেল সভাপতি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)
জ্বালানি সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে, এটি একটি জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। খুব শিগগিরই হয়তো সরকারকে এ নিয়ে জাতীয় দুর্যোগকাল হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। যার চেইন ইমপ্যাক্ট হিসেবে গোটা জাতিকে ভুগতে হবে। বস্ত্র, তৈরি পোশাকের বাইরে অন্য সব খাতের শিল্পসহ ব্যাংক, বীমা খাতও গভীর সংকটে পড়বে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে, এখন আর হয়তো গ্যাসের প্রয়োজনীয় সরবরাহ পাওয়া গেলেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। কারণ, ক্রমাগত লোকসান টানতে টানতে এখন আমাদের চলতি মূলধন ঘাটতিও প্রকট আকার নিয়েছে। উদ্যোক্তাদের দেউলিয়া হওয়ার দশা। স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলোর ধরন হচ্ছে এগুলো ভারী শিল্প। একেকটা বস্ত্রকল করতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। আমাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ এখন ২৩ বিলিয়ন ডলার। অথচ গ্যাসের অভাবে গত বছর এক ভারত থেকেই ৩০ হাজার কোটি টাকার সুতা আমদানি হয়েছে। এভাবে আমরা একটা আমদানিনির্ভর দেশে পরিণতি হচ্ছি। আমদানি না করে যদি দেশে উৎপাদিত সুতা আমরা ব্যবহার করতে পারতাম, তাহলে তৈরি পোশাকে আমাদের স্থানীয় মূল্য সংযোজন কত বেড়ে যেত পারত! কর্মসংস্থান বাড়ত। অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও এর সুফল পাওয়া যেত। এভাবে চলতে থাকলে শুধু সুতা-কাপড় নয়, আমাদের হয়তো রুটি-কলাও একদিন আমদানি করে খেতে হবে।
অধ্যাপক এম শামসুল আলম জ্বালানি উপদেষ্টা, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
আমরা নব্বই দশক থেকেই জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারপ্রধানের নির্দেশনার খবর শুনে আসছি। বিগত দিনে এ রকম একগাদা উদাহরণ পাওয়া যাবে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের টেবিলেও জ্বালানি সংকটের সমাধান খোঁজা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে আমলারা ১৪ বার ভাবে তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে কিনা। এভাবে সমাধান হয় না। এখন এলএনজি টার্মিনাল হবে, বেশি দামে এলএনজি কেনা হবে। এ রকম দামের কারণে যে হারে শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে তাতে প্রতিযোগিতার বাজারে কীভাবে টেকা যাবে। জ্বালানি নিয়ে এই অব্যবস্থাপনা থামানোর দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার। শিল্পোদ্যোক্তাসহ স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। জ্বালানি নিয়ে সরকারের যে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, সেখানেও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। এই খাতে দীর্ঘদিন ধরেই ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও সাধারণ ভোক্তার অধিকার উপেক্ষিত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। প্রতিযোগিতাহীন বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি লুণ্ঠনমূলক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে; যার পরিণতি হচ্ছে, দেশব্যাপী এই জ্বালানি সংকট। সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে।
মাহমুদ হাসান খান সভাপতি, বিজিএমইএ
জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ফলাফল। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে বলেছিলাম, দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) প্রয়োজন। তখন কর্ণপাত করা হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আমাদের অন্তত তিন থেকে চারটি এফএসআরইউ সচল রাখতে হবে, যাতে একটি বিকল হলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস না নামে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ঝুঁকি কমাতে স্থলভিত্তিক টার্মিনালের দিকে যেতে হবে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বললেও ‘হুইলিং চার্জ’ বা সঞ্চালন মাশুল নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। ৩২ পয়সার চার্জকে ২ টাকা করার প্রস্তাব দিলে কোনো বিনিয়োগকারী এগিয়ে আসবেন না। মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্টগুলোকে উৎসাহিত করতে হলে এই বাধা দূর করতে হবে। দেশে প্রায় ১২ লাখ সেচ পাম্প রয়েছে, যা ডিজেলে চলে। এগুলোকে দ্রুত সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করতে পারলে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎ শিল্পকারখানায় দেওয়া যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমি একদম ক্যাটেগরি করে বলছি, এফএসআরইউ লাগবে আরও দুটি। এ কারণে লাগবে যে দুটি লাইন আছে, ভবিষ্যতে আরও একটা লাগবে। তিনটি চলমান থাকতে হবে, একটি স্ট্যান্ডবাই। চারটি এনে চারটিই যদি চলমান রাখি তাহলে ওই অনুযায়ী আমাদের ডিমান্ড তৈরি হবে। কিন্তু করা হয়নি। না করার কনসিকুয়েন্স হলো, আজকের এ সংকট।
আবু আলম শহীদ খান সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব
জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। আমরা যদি ২০ বছরের সুদূরপ্রসারী চিন্তা না করি, তবে আগামী ৪৬ বছর ধরেও কেবল সমস্যা নিয়েই আলোচনা করতে হবে। সাত দিনের মাথায় সমাধান বা জরুরি ভিত্তিতে এফএসআরইউ স্থাপনের যে তোড়জোড় আমরা দেখি, তা টেকসই কোনো সমাধান নয়। সুশাসনের অভাব আমাদের জ্বালানি খাত কুরে কুরে খাচ্ছে। যেখানে টেকনিক্যাল সিস্টেম লস ২ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়, সেখানে আমাদের গ্যাস সেক্টরে ১০ থেকে ১২ শতাংশ লস দেখানো হচ্ছে। এটি আসলে সিস্টেম লস নয়, বরং অব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের অভাব। পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা দিনে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পায় না। আর আমরা শহরে বসে বসে বাসায় চার-পাঁচটা এসি চালাই। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চলে; তবুও এসি বন্ধ হয় না। বাপেক্স নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলে। আমরা সবাই জানি, আমাদের কোথায় কী যোগ্যতা, কী সীমাবদ্ধতা আছে। আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং মনে হয়, আরাকান বা রাখাইনের গ্যাস কেন আমরা পাই না। একসময় রাখাইন থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারত যাওয়ার গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছিল। ২০০৫ সালে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত এমওইউটা হলো না। পরে যা হলো, চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন চুক্তি করল রাখাইনের সঙ্গে।
ড. ইজাজ হোসেন সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট)
শিল্প খাতের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। শিল্পমালিকরা দিশেহারা। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা–উভয়ই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে শিল্পায়নের পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হবে। অধিক জ্বালানিনির্ভর শিল্প যেমন–টেক্সটাইল, সিমেন্ট বা স্টিল মিল কীভাবে টিকে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে জ্বালানি খাতে অনেক সংস্কার করতে পারত, কিন্তু তা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে জ্বালানি সংকট থাকলেও শিল্পকারখানাগুলো কোনোভাবে টিকে ছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ খাতে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালু হওয়ায় কিছুটা সুবিধা মিললেও শিল্প খাতের সংকট কাটেনি। শিল্পোদ্যোক্তারা এখন গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের চাপেও পড়েছেন। শুধু সরবরাহের সমস্যা থাকলে তা সমাধান করা সম্ভব হতো, কিন্তু এখন সরবরাহ ও মূল্য–দুই দিক থেকেই সংকট রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি আগে জানা থাকলে অনেকেই নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করতেন না। বর্তমানে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। তাই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শিল্পনীতি প্রণয়ন করতে হবে। পরিকল্পনা ছাড়া শিল্প স্থাপন করলে তা টেকসই হবে না। তাই দেশের বাস্তবতা ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়েই শিল্পায়নের পরিকল্পনা করতে হবে।
খোরশেদ আলম সভাপতি, বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই)
আমরা দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চাইছি, কিন্তু বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। কুমিল্লা ইপিজেডে একটি বড় চীনা কোম্পানি ছয় বছর আগে জমির বরাদ্দ পেয়ে গ্যাসের জন্য দরখাস্ত করেছে। আজ পর্যন্ত তাদের গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। আনোয়ারায় চীনের বিনিয়োগকারীদের অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প নেওয়া হয়েছে ৭০০ একর জমির ওপর। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ১৮ মাসের মধ্যে এই কার্যক্রম শুরু হবে। এই সময়ের ভেতরে সেখানে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিনিয়োগের জন্য আমরা বিদেশ থেকে লোক নিয়ে আসছি। সরকারের কাছে প্রশ্ন–যারা এখানে বিনিয়োগ করে জমি কিনেছেন তাদের চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন নাকি গ্যাস দেবেন? সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের পক্ষ থেকে বলা হয়– এই জায়গায় কয়লা তোলা যাবে না, ওই জায়গায় গভীর বেশি। আমার কাছে চীন থেকে কয়েকটা গ্রুপ এসেছে। তাদের এসব তথ্যের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে। তারা কয়লার বিষয়ে আগ্রহী। এখন তাদের আপত্তি ঠিক কিনা জানি না। এজন্য কয়লার বিষয়ে জরিপের জন্য তৃতীয় পক্ষকে সংযুক্ত করা যেতে পারে।
মো. শাহরিয়ার সভাপতি, বিজিএপিএমইএ
তনুল চক্রবর্তী বিভাগীয় প্রধান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ, হা-মীম গ্রুপ
সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে বর্তমানের জ্বালানি সংকটের তীব্রতা এড়ানো যেত। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সরবরাহের অভাবে অনেক কেন্দ্র অলস বসে আছে। বিশেষ করে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে অব্যবস্থাপনা, সংকটকালীন তিতাস গ্যাসকে অযৌক্তিকভাবে অন্যান্য গ্যাস বিতরণ কোম্পানির তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কমানো, আন্তঃসরকারি বিদ্যুৎ, গ্যাস কোম্পানিগুলোর সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সংকটের বড় প্রভাব পড়ছে রপ্তানিমুখী শিল্পে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ নিচে কাজ করছে। যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে উদ্যোক্তারা আকাশপথে পণ্য পাঠাচ্ছেন, যা তীব্র আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের কাছে আস্থার এ সংকটের কারণে আগামীতে রপ্তানি আদেশ কমে যেতে পারে। এ ছাড়া গ্যাসের কার্যকর বিকল্প জ্বালানি ডিজেল হওয়ায়, তা ব্যবহার করতে গিয়ে জ্বালানি খরচ বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শিল্পের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এখন বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে প্রাথমিক/প্রধান জ্বালানির প্রাপ্যতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা বেশি জরুরি।
শাহেদ মুহাম্মদ আলী সম্পাদক, সমকাল
দেশের অর্থনীতির প্রধান সংকট এখন জ্বালানির প্রাপ্যতা। গ্যাস সরবরাহ, জ্বালানি পরিকল্পনা ও জ্বালানি খাতের সুশাসন তাই আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ খাতে সীমাবদ্ধ নয়; রপ্তানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় ঘুরেফিরে সামনে এসেছে। এগুলো হলো–জ্বালানি সংকট কি সম্পদের ঘাটতি, নাকি সুশাসনের অভাব? এলএনজিনির্ভরতার বিপরীতে সমাধান হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান। প্রশ্ন উঠেছে, জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় সংস্কারটি কোথায় প্রয়োজন–নীতি, প্রতিষ্ঠান, নাকি ব্যবস্থাপনায়? চলমান সংকট সামনে আনছে সাময়িক কিছু প্রশ্নও। শিল্পে গ্যাসের অগ্রাধিকার কি নতুনভাবে নির্ধারণ করা উচিত? কারণ, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি কতটা কার্যকর হতে পারে? আমরা বলছি, এলএনজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দেশীয় গ্যাস সম্পদ–এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় এবং এর জন্য ভারসাম্যপূর্ণ নীতি দরকার। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। প্রশ্ন থেকে যায়, এসব আমরা কবে পাব?
দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা সমাধানে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিতে হবে। গ্যাস সরবরাহ ও নতুন সংযোগে শিল্পকারখানাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আপৎকালীন সংকট সমাধানে স্বল্পমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানে দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা নিতে হবে। জ্বালানি খাতের সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করতে হবে। কয়লাভিত্তিক গ্যাস উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসে সমাধান খুঁজতে হবে। জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সিস্টেম লসের নামে চুরি বন্ধ করতে হবে।
বিষয় : গোলটেবিল

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬
গ্যাসের অভাবে দেশের শিল্পকারখানা বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাহিদার অর্ধেক গ্যাসও মিলছে না। এতে সক্ষমতার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কম উৎপাদন হচ্ছে কারখানায়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্প বাঁচাতে সঠিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। গত ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার সমকাল আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতে সংকট: উত্তরণে করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে এমন পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। এতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়
জ্বালানি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের বিল পরিশোধের বিষয়টি উদারভাবে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্লক অ্যাকাউন্টে নিয়ে পরে কিস্তিতে পরিশোধ করতে পারে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১৪ বছরের সমস্যা বর্তমান সরকারের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা না করে এলএনজি আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছে দেশকে। তবে সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বাপেক্সকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা ও সমন্বয় করা হচ্ছে। অতীতে গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা করা হয়েছিল এবং বাপেক্সকে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছিল। বর্তমানে বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে নতুন রিগ কেনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পর্যাপ্ত খনি অনুসন্ধান না হওয়ায় দেশ বর্তমানে গ্যাস আমদানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া একটি এফএসআরইউ টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ফলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় দ্রুততম সময়ে একটি চীনা কোম্পানিকে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া তৃতীয় এফএসআরইউর সঙ্গে সমন্বয় করে বাখরাবাদ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। দেশের জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি শিল্প খাতের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
মাহবুবুর রহমান সভাপতি, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি)
বর্তমানে একটি বিতর্ক চলছে–গ্যাস কোথায় অগ্রাধিকার পাবে। গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রে যাবে, শিল্পে যাবে, নাকি সার কারখানায়। তিন সেক্টরেই যেতে হবে। কারণ সবগুলোই দরকারি এবং একটির সঙ্গে অন্যটি যুক্ত। শিল্পে গ্যাস না দিলে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। অথচ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নতুন কোনো শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না। শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি দেওয়া না হলে শিল্পমালিকরা ব্যাংকের ঋণের কিস্তি শোধ করতে পারবেন না। ফলে দেশে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমবে। এলএনজি আমদানির জন্য স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে গ্যাস কেনা সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার বলছে, দেশে বিনিয়োগ আসুক। যেখানে অফিসিয়ালি বলা হচ্ছে, নতুন কোনো গ্যাস সংযোগ দেওয়া যাবে না সেখানে কীভাবে বিনিয়োগ আসবে। আমরা দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরে জলে-স্থলে কোথাও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করিনি। এখন নির্বাচিত কিছু জায়গায় হচ্ছে। যেমন ভোলায়। সেখানে গ্যাস শনাক্ত হয়েছে ২০১৮ সালে, আজকে ২০২৬ সাল। এখন পর্যন্ত সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সেখানকার গ্যাস পাইপে করে নিয়ে আসতে পারবে কিনা। দুর্ভাগ্যজনক হলো–এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত এবং এর বাস্তবায়ন খুবই ধীরগতিতে চলছে। নবায়নযোগ্য শক্তি– যেমন সোলার এনার্জি যার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে আমরা সহজেই বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারি। সুশাসন নিশ্চিত না করে এবং স্টেকহোল্ডারদের পাশ কাটিয়ে কেবল আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে জ্বালানি সংকট কাটানো সম্ভব নয়। বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
জালাল আহমেদ চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন
আমাদের পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ খাতের মতো জ্বালানি খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিগত ১৫ বছরের বাজেটে কোনো কোনো বছরের বিদ্যুৎ খাতের বাজেট জ্বালানি খাতের চেয়ে ২০ গুণ বেশি ছিল। আমাদের এনার্জি পলিসিতে রয়েছে, প্রতি বছর অন্তত চারটা কূপ খনন করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা কোনো কোনো বছর একটা কূপও খনন করিনি। আমরা যদি যথেষ্ট অনুসন্ধান করতাম বিশেষ করে সিসমিক জরিপ, তাহলে গ্যাস আছে কিনা তা জানতে পারতাম। আমাদের আগ্রাসী অনুসন্ধান চালাতে হবে, স্থলে ও জলে। আমরা সমুদ্র বিজয় করেছি কিন্তু সমুদ্রের ভেতর কী আছে জানি না। এবারের বাজেটেও ড্রিলিংয়ের জন্য যথেষ্ট বাজেট নেই। ড্রিলিংয়ের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি দরকার নেই। এখানে উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের দেশীয় গ্যাসের প্রধান উৎস বিবিয়ানার উৎপাদন যে হারে কমছে, তা আশঙ্কাজনক। বিবিয়ানা থেকে অতিরিক্ত গ্যাস তুলে ফেলছি, যার ফলে ২০ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এখন আমাদের বড় আশা ‘তিতাস ডিপ ড্রিলিং’। ৬০০০ মিটার গভীরে যদি আমরা ভালো কোনো স্তর পাই, তবেই এটি জাতীয় গ্রিডে বড় সাপোর্ট দিতে পারবে। অন্যথায় শুধু ছোটোখাটো কূপ খনন করে বিশাল ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়। এক কিলোমিটার মাটির নিচ থেকে কয়লা উত্তোলন করতে যে প্রযুক্তি এবং ব্যয় সেটি আমাদের জন্য আসলে পোষাবে না। এক কিলোমিটার নিচের কয়লাকে মিথেন গ্যাস করে আনা যায়। ভোলার গ্যাস নিয়ে পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই গ্যাস দ্রুততম সময়ে ঢাকা এবং বরিশাল অঞ্চলে আনা জরুরি। পদ্মা সেতুর ওপর পাইপলাইন সুবিধা থাকায় ভোলা-বরিশাল লাইনটি সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি।
মাহমুদুর রহমান মান্না সভাপতি, নাগরিক ঐক্য
দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের যে সংকট, তা মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে। পত্রিকায় দেখা গেল, সহসাই এ কারিগরি ত্রুটির সমাধান হয়ে যাবে। তবে এ স্বাভাবিক হওয়া আদৌ স্বাভাবিক নয়। আমদানি করা এলএনজি স্বাভাবিক গ্যাসে পরিণত করে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ে ১৫-২০ টাকা। আবার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করলে বিদ্যুতের দাম পড়ে ২০-২৫ টাকা। এ টাকা জনগণের পকেট থেকে যায়। ভর্তুকি সামাল দিতে সরকার প্রায়ই বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। সরকার সমস্যার মূলে দৃষ্টি দিচ্ছে না। আমাদের গভীর সমুদ্রে যে বিপুল পরিমাণ গ্যাস আছে, তা উত্তোলনে আন্তরিক মনোযোগ নেই। সম্প্রতি গভীর সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলনে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যতদূর জেনেছি, দরপত্রে প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্টে (পিএসসি) গ্যাস রপ্তানির বিধান রাখা হচ্ছে। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দেশবাসী জানে না, সংসদে আলোচনা হচ্ছে না। এটা কাম্য নয়। জনস্বার্থ, দেশের স্বার্থ রক্ষা করে গ্যাস উত্তোলনের চুক্তি করা উচিত। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে হইচই ফেলে দিয়েছে। আমার জানা মতে, বর্তমান সৌরবিদ্যুৎ নীতিমালায় সরকার বিনিয়োগকারীর সঙ্গে শুধু বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি করবে। অর্থাৎ নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট। বিদ্যুৎ কেনা, না কেনা সরকারের মর্জির ওপর থাকবে। বিদ্যুৎ বিক্রির নিশ্চয়তা না পেলে কোনো বিনিয়োগকারী সৌরবিদ্যুতে আগ্রহী হবেন না। সরকারকে নীতিমালা সংশোধন করে বিনিয়োগকারীর সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা এবং বিদ্যুৎ বিক্রির নিশ্চয়তা দিতে হবে। কারণ দেশের মানুষকে স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ দিতে হবে।
মীর নাসির হোসেন সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই
জ্বালানি খাতে সমন্বয় নেই। আজকে আমরা গ্যাস পাচ্ছি না। গত দুই মাসে আমার কারখানা ৫২ শতাংশ কম গ্যাস পেয়েছে। এতে উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কিন্তু আমাদের ব্যয় কমেনি। ব্যাংক ঋণের সুদ দিতে হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য ঢাকঢোল পেটানো হচ্ছে অথচ স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধা না পেয়ে বিপদে আছেন। সার কারখানায় গ্যাস না দিয়ে তা যদি টেক্সটাইল বা অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পে দেওয়া যায়, তবে অর্থনীতির জন্য তা বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। সিস্টেম লসের নামে চুরি চলছে। যে জোনে গ্যাস চুরি হচ্ছে সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি কেন করা হচ্ছে না? আজকে গ্যাসের লাইন কাটা হয়, কালকে আবার সেটি পুনঃসংযোগ হয়। গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে বাসাবাড়ি নাকি শিল্পে অগ্রাধিকার দেবে–সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাসাবাড়িতে কেন লাইনের গ্যাস অব্যাহত রাখা হচ্ছে? এসব বিষয় ভালোভাবে দেখা না হলে গ্যাস সংকট থেকে আমরা বের হতে পারবো না। সোলার প্লান্ট করতে গেলে প্রচুর জায়গার দরকার। জায়গা আছে এবং সরকারকেই সেভাবে বরাদ্দ করে দিতে হবে। জায়গা সরকারের কাছ থেকে নেওয়া খুব কঠিন আর ব্যাটারির ব্যাকআপের খরচ কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যয়বহুল।
মোহাম্মদ হাতেম সভাপতি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)
গ্যাস সরবরাহ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় শিল্প খাতে এক ভয়াবহ মানবিক ও আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস নেই। আগামী ১০ আগস্টের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে প্রায় ২৫ দিন কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যত বন্ধ থাকবে। এর ফলে আমরা নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্য পাঠাতে পারব না। ক্রেতাকে সন্তুষ্ট রাখতে বিশাল অঙ্কের খরচ দিয়ে এয়ার শিপমেন্ট করতে হবে। অন্যথায় ক্রেতারা অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ডিসকাউন্ট চাইবে। পাম্প থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস নিয়ে আমরা টিকে থাকার চেষ্টা করছিলাম। এটার জন্য যেখানে তিতাসের অনুতপ্ত হওয়া দরকার, উল্টো তারা চিঠি দিয়ে বাধা দেওয়া হয়েছে। অনুরোধ করব, তিতাস যাতে এ তৎপরতা থেকে বিরত থাকে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, মাসের শুরুতে শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে। উৎপাদন না হলে বেতন পরিশোধ কঠিন হবে। বেতন ঠিকমতো না দিতে পারলে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে। ব্যাংকের ঋণের কিস্তি দিতে না পারলে আমাদের খেলাপি ঘোষণা করা হবে। যদি ঋণ শেষ পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয় তাহলে কারখানার সব কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এ অবস্থায় সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থমন্ত্রী, জ্বালানিমন্ত্রী এবং বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই বিশেষ পরিস্থিতিতে শিল্প মালিকদের প্রতি সহনশীল হয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ কোনো সমাধান দেওয়ার অনুরোধ করব। তা নাহলে শিল্প ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়বে।
আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ সাবেক সভাপতি বিজিএমইএ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইভিন্স গ্রুপ
জ্বালানির সংকটময় পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে দুই ধরনের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া। গত কয়েক সপ্তাহের তীব্র সংকটময় পরিস্থিতি শিল্প উৎপাদন যেখানে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, সেখানে গ্যাস সরবরাহ রেশনিং করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পকারখানায় যতটা সম্ভব সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা। প্রয়োজনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গ্যাস এনেও শিল্পে দিতে হবে। কারণ, শিল্পকারখানা বন্ধ থাকলে তার বহুমুখী অভিঘাত আসে অর্থনীততে। রপ্তানি আয় কমবে। বেকার হবে শ্রমিক। এমনিতেই দেশে পণ্য ও সেবা বেশি দামে কিনতে হয় অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার অস্বাভাবিক বেশি। তো সেখানে এ রকম একটা পরিস্থিতির পরিণতিটা আমাদের সবাইকে আগে থেকেই অনুমান করতে হবে। এ ছাড়া গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে যে সিস্টেম লস আছে সেটা শূন্য হারে নামিয়ে আনতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা হিসেবে কয়লাভিত্তিক গ্যাস উৎপাদনে যেতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তিতে কয়লাকে গ্যাসে রূপান্তরের যত সব প্রক্রিয়া রয়েছে সেসব প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া। কারণ গ্যাসের সংকটের স্বল্প মেয়াদের পরিকল্পনা দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা সমাধান করা যাবে না। অর্থাৎ গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতেই সেটা যেভাবেই হোক না কেন। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে, শিল্প উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার মতো গ্যাস আমরা পাচ্ছি না। জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার চেষ্টা করছে। আমরাও চাই সরকারকে সহযোগিতা করতে; যেখানে আমাদের পক্ষে সম্ভব।
শওকত আজিজ রাসেল সভাপতি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)
জ্বালানি সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে, এটি একটি জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। খুব শিগগিরই হয়তো সরকারকে এ নিয়ে জাতীয় দুর্যোগকাল হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। যার চেইন ইমপ্যাক্ট হিসেবে গোটা জাতিকে ভুগতে হবে। বস্ত্র, তৈরি পোশাকের বাইরে অন্য সব খাতের শিল্পসহ ব্যাংক, বীমা খাতও গভীর সংকটে পড়বে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে, এখন আর হয়তো গ্যাসের প্রয়োজনীয় সরবরাহ পাওয়া গেলেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। কারণ, ক্রমাগত লোকসান টানতে টানতে এখন আমাদের চলতি মূলধন ঘাটতিও প্রকট আকার নিয়েছে। উদ্যোক্তাদের দেউলিয়া হওয়ার দশা। স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলোর ধরন হচ্ছে এগুলো ভারী শিল্প। একেকটা বস্ত্রকল করতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। আমাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ এখন ২৩ বিলিয়ন ডলার। অথচ গ্যাসের অভাবে গত বছর এক ভারত থেকেই ৩০ হাজার কোটি টাকার সুতা আমদানি হয়েছে। এভাবে আমরা একটা আমদানিনির্ভর দেশে পরিণতি হচ্ছি। আমদানি না করে যদি দেশে উৎপাদিত সুতা আমরা ব্যবহার করতে পারতাম, তাহলে তৈরি পোশাকে আমাদের স্থানীয় মূল্য সংযোজন কত বেড়ে যেত পারত! কর্মসংস্থান বাড়ত। অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও এর সুফল পাওয়া যেত। এভাবে চলতে থাকলে শুধু সুতা-কাপড় নয়, আমাদের হয়তো রুটি-কলাও একদিন আমদানি করে খেতে হবে।
অধ্যাপক এম শামসুল আলম জ্বালানি উপদেষ্টা, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
আমরা নব্বই দশক থেকেই জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারপ্রধানের নির্দেশনার খবর শুনে আসছি। বিগত দিনে এ রকম একগাদা উদাহরণ পাওয়া যাবে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের টেবিলেও জ্বালানি সংকটের সমাধান খোঁজা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে আমলারা ১৪ বার ভাবে তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে কিনা। এভাবে সমাধান হয় না। এখন এলএনজি টার্মিনাল হবে, বেশি দামে এলএনজি কেনা হবে। এ রকম দামের কারণে যে হারে শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে তাতে প্রতিযোগিতার বাজারে কীভাবে টেকা যাবে। জ্বালানি নিয়ে এই অব্যবস্থাপনা থামানোর দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার। শিল্পোদ্যোক্তাসহ স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। জ্বালানি নিয়ে সরকারের যে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, সেখানেও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। এই খাতে দীর্ঘদিন ধরেই ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও সাধারণ ভোক্তার অধিকার উপেক্ষিত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। প্রতিযোগিতাহীন বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি লুণ্ঠনমূলক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে; যার পরিণতি হচ্ছে, দেশব্যাপী এই জ্বালানি সংকট। সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে।
মাহমুদ হাসান খান সভাপতি, বিজিএমইএ
জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ফলাফল। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে বলেছিলাম, দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) প্রয়োজন। তখন কর্ণপাত করা হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আমাদের অন্তত তিন থেকে চারটি এফএসআরইউ সচল রাখতে হবে, যাতে একটি বিকল হলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস না নামে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ঝুঁকি কমাতে স্থলভিত্তিক টার্মিনালের দিকে যেতে হবে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বললেও ‘হুইলিং চার্জ’ বা সঞ্চালন মাশুল নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। ৩২ পয়সার চার্জকে ২ টাকা করার প্রস্তাব দিলে কোনো বিনিয়োগকারী এগিয়ে আসবেন না। মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্টগুলোকে উৎসাহিত করতে হলে এই বাধা দূর করতে হবে। দেশে প্রায় ১২ লাখ সেচ পাম্প রয়েছে, যা ডিজেলে চলে। এগুলোকে দ্রুত সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করতে পারলে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎ শিল্পকারখানায় দেওয়া যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমি একদম ক্যাটেগরি করে বলছি, এফএসআরইউ লাগবে আরও দুটি। এ কারণে লাগবে যে দুটি লাইন আছে, ভবিষ্যতে আরও একটা লাগবে। তিনটি চলমান থাকতে হবে, একটি স্ট্যান্ডবাই। চারটি এনে চারটিই যদি চলমান রাখি তাহলে ওই অনুযায়ী আমাদের ডিমান্ড তৈরি হবে। কিন্তু করা হয়নি। না করার কনসিকুয়েন্স হলো, আজকের এ সংকট।
আবু আলম শহীদ খান সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব
জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। আমরা যদি ২০ বছরের সুদূরপ্রসারী চিন্তা না করি, তবে আগামী ৪৬ বছর ধরেও কেবল সমস্যা নিয়েই আলোচনা করতে হবে। সাত দিনের মাথায় সমাধান বা জরুরি ভিত্তিতে এফএসআরইউ স্থাপনের যে তোড়জোড় আমরা দেখি, তা টেকসই কোনো সমাধান নয়। সুশাসনের অভাব আমাদের জ্বালানি খাত কুরে কুরে খাচ্ছে। যেখানে টেকনিক্যাল সিস্টেম লস ২ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়, সেখানে আমাদের গ্যাস সেক্টরে ১০ থেকে ১২ শতাংশ লস দেখানো হচ্ছে। এটি আসলে সিস্টেম লস নয়, বরং অব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের অভাব। পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা দিনে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পায় না। আর আমরা শহরে বসে বসে বাসায় চার-পাঁচটা এসি চালাই। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চলে; তবুও এসি বন্ধ হয় না। বাপেক্স নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলে। আমরা সবাই জানি, আমাদের কোথায় কী যোগ্যতা, কী সীমাবদ্ধতা আছে। আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং মনে হয়, আরাকান বা রাখাইনের গ্যাস কেন আমরা পাই না। একসময় রাখাইন থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারত যাওয়ার গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছিল। ২০০৫ সালে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত এমওইউটা হলো না। পরে যা হলো, চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন চুক্তি করল রাখাইনের সঙ্গে।
ড. ইজাজ হোসেন সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট)
শিল্প খাতের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। শিল্পমালিকরা দিশেহারা। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা–উভয়ই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে শিল্পায়নের পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হবে। অধিক জ্বালানিনির্ভর শিল্প যেমন–টেক্সটাইল, সিমেন্ট বা স্টিল মিল কীভাবে টিকে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে জ্বালানি খাতে অনেক সংস্কার করতে পারত, কিন্তু তা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে জ্বালানি সংকট থাকলেও শিল্পকারখানাগুলো কোনোভাবে টিকে ছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ খাতে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালু হওয়ায় কিছুটা সুবিধা মিললেও শিল্প খাতের সংকট কাটেনি। শিল্পোদ্যোক্তারা এখন গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের চাপেও পড়েছেন। শুধু সরবরাহের সমস্যা থাকলে তা সমাধান করা সম্ভব হতো, কিন্তু এখন সরবরাহ ও মূল্য–দুই দিক থেকেই সংকট রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি আগে জানা থাকলে অনেকেই নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করতেন না। বর্তমানে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। তাই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শিল্পনীতি প্রণয়ন করতে হবে। পরিকল্পনা ছাড়া শিল্প স্থাপন করলে তা টেকসই হবে না। তাই দেশের বাস্তবতা ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়েই শিল্পায়নের পরিকল্পনা করতে হবে।
খোরশেদ আলম সভাপতি, বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই)
আমরা দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চাইছি, কিন্তু বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। কুমিল্লা ইপিজেডে একটি বড় চীনা কোম্পানি ছয় বছর আগে জমির বরাদ্দ পেয়ে গ্যাসের জন্য দরখাস্ত করেছে। আজ পর্যন্ত তাদের গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। আনোয়ারায় চীনের বিনিয়োগকারীদের অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প নেওয়া হয়েছে ৭০০ একর জমির ওপর। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ১৮ মাসের মধ্যে এই কার্যক্রম শুরু হবে। এই সময়ের ভেতরে সেখানে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিনিয়োগের জন্য আমরা বিদেশ থেকে লোক নিয়ে আসছি। সরকারের কাছে প্রশ্ন–যারা এখানে বিনিয়োগ করে জমি কিনেছেন তাদের চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন নাকি গ্যাস দেবেন? সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের পক্ষ থেকে বলা হয়– এই জায়গায় কয়লা তোলা যাবে না, ওই জায়গায় গভীর বেশি। আমার কাছে চীন থেকে কয়েকটা গ্রুপ এসেছে। তাদের এসব তথ্যের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে। তারা কয়লার বিষয়ে আগ্রহী। এখন তাদের আপত্তি ঠিক কিনা জানি না। এজন্য কয়লার বিষয়ে জরিপের জন্য তৃতীয় পক্ষকে সংযুক্ত করা যেতে পারে।
মো. শাহরিয়ার সভাপতি, বিজিএপিএমইএ
তনুল চক্রবর্তী বিভাগীয় প্রধান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ, হা-মীম গ্রুপ
সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে বর্তমানের জ্বালানি সংকটের তীব্রতা এড়ানো যেত। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সরবরাহের অভাবে অনেক কেন্দ্র অলস বসে আছে। বিশেষ করে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে অব্যবস্থাপনা, সংকটকালীন তিতাস গ্যাসকে অযৌক্তিকভাবে অন্যান্য গ্যাস বিতরণ কোম্পানির তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কমানো, আন্তঃসরকারি বিদ্যুৎ, গ্যাস কোম্পানিগুলোর সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সংকটের বড় প্রভাব পড়ছে রপ্তানিমুখী শিল্পে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ নিচে কাজ করছে। যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে উদ্যোক্তারা আকাশপথে পণ্য পাঠাচ্ছেন, যা তীব্র আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের কাছে আস্থার এ সংকটের কারণে আগামীতে রপ্তানি আদেশ কমে যেতে পারে। এ ছাড়া গ্যাসের কার্যকর বিকল্প জ্বালানি ডিজেল হওয়ায়, তা ব্যবহার করতে গিয়ে জ্বালানি খরচ বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শিল্পের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এখন বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে প্রাথমিক/প্রধান জ্বালানির প্রাপ্যতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা বেশি জরুরি।
শাহেদ মুহাম্মদ আলী সম্পাদক, সমকাল
দেশের অর্থনীতির প্রধান সংকট এখন জ্বালানির প্রাপ্যতা। গ্যাস সরবরাহ, জ্বালানি পরিকল্পনা ও জ্বালানি খাতের সুশাসন তাই আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ খাতে সীমাবদ্ধ নয়; রপ্তানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় ঘুরেফিরে সামনে এসেছে। এগুলো হলো–জ্বালানি সংকট কি সম্পদের ঘাটতি, নাকি সুশাসনের অভাব? এলএনজিনির্ভরতার বিপরীতে সমাধান হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান। প্রশ্ন উঠেছে, জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় সংস্কারটি কোথায় প্রয়োজন–নীতি, প্রতিষ্ঠান, নাকি ব্যবস্থাপনায়? চলমান সংকট সামনে আনছে সাময়িক কিছু প্রশ্নও। শিল্পে গ্যাসের অগ্রাধিকার কি নতুনভাবে নির্ধারণ করা উচিত? কারণ, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি কতটা কার্যকর হতে পারে? আমরা বলছি, এলএনজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দেশীয় গ্যাস সম্পদ–এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় এবং এর জন্য ভারসাম্যপূর্ণ নীতি দরকার। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। প্রশ্ন থেকে যায়, এসব আমরা কবে পাব?
দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা সমাধানে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিতে হবে। গ্যাস সরবরাহ ও নতুন সংযোগে শিল্পকারখানাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আপৎকালীন সংকট সমাধানে স্বল্পমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানে দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা নিতে হবে। জ্বালানি খাতের সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করতে হবে। কয়লাভিত্তিক গ্যাস উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসে সমাধান খুঁজতে হবে। জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সিস্টেম লসের নামে চুরি বন্ধ করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন