প্রিন্ট এর তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানহীন ছাপা, পাঠ্যবইয়ের কোটি ফর্মা বাতিল
||
২০২৭ সালের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বিনা মূল্যের ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি পাঠ্যবই ছাপাতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ১৩৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। বই মুদ্রণে গতবারের চেয়ে এবার খরচ বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। আবার সিন্ডিকেট করে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১০০ কোটি টাকা বেশি দর দিয়েছে ছাপাখানাগুলো। সব মিলিয়ে এবার পাঠ্যবই ছাপাতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা! তারপরও অধিক মুনাফার লোভে রাতের আঁধারে নিম্নমানের পাঠ্যবই ছাপানোর হিড়িক পড়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘মিনিস্ট্রি টিম’, এনসিটিবির পরিদর্শন টিম ও ইন্সপেকশন এজেন্ট সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শন করে ৫২ ছাপাখানার প্রাথমিকের নিম্নমানের পাঠ্যবইয়ের ১ কোটির বেশি ফর্মা কেটে বিনষ্ট করেছে। ফর্মা মিসিং, ডাবল ফর্মা, আলট্রা ভার্নিশ না করা, বাঁধাইয়ে ত্রুটি ও নিম্নমানের কালি ব্যবহারের চিত্রও হাতেনাতে ধরা পড়েছে। বই দেখতে ঝাপসা, কাগজ খসখসে, ছাপা লেপ্টে যাওয়ার ঘটনা যাতে আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য সতর্ক করা হয়েছে ছাপাখানাগুলোর মালিকদের। কয়েকটি ছাপাখানা পাঠ্যবইয়ের প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠায় ভালো মানের কাগজ ব্যবহার করেছে, ভেতরে পৃষ্ঠাগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে মানহীন কাগজ। সংশ্লিষ্ট সূত্র ইত্তেফাককে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, গত বুধবার মোল্লা প্রেস এন্ড পাবলিকেশন এবং অটো প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং ছাপাখানায় সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে নিম্নমানের পাঠ্যবই হাতেনাতে ধরে ‘মিনিস্ট্রি টিম’। এই দুই ছাপাখানা পঞ্চম শ্রেণির সমাজ বিজ্ঞান বইয়ের মানচিত্রের কালার পরিবর্তন করে। মানচিত্রের পাশের লেখাগুলো একেবারেই অস্পষ্ট। এ কারণে এসব বই কেটে বিনষ্ট করেছে মিনিস্ট্রি টিম ও ইন্সপেকশন এজেন্ট। একই সঙ্গে মিনিস্ট্রি টিম পাঠ্যবই ছাপাতে ব্যবহার করা নিম্নমানের প্রচুর পরিমাণ কালি এই দুই ছাপাখানাস্থল থেকে জব্দ করে ড্রেনে ফেলে বিনষ্ট করেছে। পরদিন বৃহস্পতিবার শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এনসিটিবিতে যান। এ সময় মোল্লা প্রেস এন্ড পাবলিকেশন এবং অটো প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিংয়ের মালিক মিন্টু মোল্লাকে এনসিটিবিতে তলব করা হয়। নিম্নমানের কালি ব্যবহার করে পাঠ্যবই ছাপানোর জন্য মিন্টু মোল্লার কাছে ‘ধমকের সুরে’ ব্যাখ্যা চান শিক্ষামন্ত্রী। তখন ভবিষ্যতে আর ভুল কিংবা অনিয়ম করবেন না প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমা চান মিন্টু মোল্লা। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে মিন্টু মোল্লা গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, সামান্য কিছু পাঠ্যবইয়ে ত্রুটি ছিল। সেগুলো পুনরায় ছাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে রেদওয়ানিয়া প্রেস এন্ড পাবলিকেশনে গিয়ে নিম্নমানের পাঠ্যবই হাতেনাতে ধরেছে মিনিস্ট্রি টিম ও এনসিটিবির ইন্সপেকশন এজেন্ট। নিম্নমানের বইগুলো কেটে ফেলা হয়। লেটার এন্ড কালার ছাপাখানাও নিম্নমানের পাঠ্যবই ও ‘এসো লিখতে শিখি’ খাতা ছাপিয়েছে। এগুলো জব্দ করে কাটা হয়েছে। ফরাজি প্রেসের নিম্নমানের পাঠ্যবই সরেজমিনে গিয়ে জব্দ করে মিনিস্ট্রি টিম। এ সময় বড় একটি ছাপাখানার মালিক ফরাজি প্রেসে গিয়ে নিম্নমানের বই কাটতে বাধা দেন। এতে মিনিস্ট্রি টিম ক্ষুব্ধ হয়।
এনসিটিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, অধিকাংশ ছাপাখানা পাঠ্যবইয়ের ফর্মা মিসিং, ডাবল ফর্মা, আলট্রা ভার্নিশ না করা, বাঁধাইয়ে ত্রুটি ও নিম্নমানের কালি ব্যবহার করেছে। যা তদন্তে ধরা পড়েছে। অনেক ছাপাখানার কাটিংও নিম্নমানের। সব মিলিয়ে অধিকাংশ ছাপাখানা দরপত্রের শর্ত মানছে না। বড় কোম্পানির কাগজ মিলের সরবরাহকৃত কাগজ বেশির ভাগ ছাপাখানা ব্যবহার করছে না। ছোট ছোট কাগজ কল থেকে কম মূল্যে কাগজ কিনে পাঠ্যবই ছাপানোর দিকে ঝুঁকেছে অধিকাংশ ছাপাখানা।
ইন্সপেকশন কোম্পানির প্রধানকে হুমকি : এনসিটিবির প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই ইন্সপেকশনের কাজ পেয়েছে ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি)। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজীম মুনিরকে ম্যানেজ করে নিম্নমানের কাগজ অনুমোদন করাতে না পেরে তাকে জীবননাশের হুমকি দিয়েছেন নিম্নমানের কাগজ সাপ্লাইকারী দুই জন। প্রসঙ্গত, পাঠ্যবই ছাপানোর আগে কাগজের অনুমোদন নিতে হয়। ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে এই অনুমোদন দেয় এনসিটিবির ইন্সপেকশন এজেন্ট।
অনেকে সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ কাজ পেয়েছে : জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কন্ট্রোলার মো. লুত্ফর রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, পাঠ্যবইয়ের মান ঠিক রাখতে এবার কঠোর নজরদারি অব্যাহত রেখেছে এনসিটিবি। কেউ অনিয়মে জড়িত থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার অনিয়মে জড়িত একটি ছাপাখানার মালিককে তলব করে সতর্ক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে সিন্ডিকেটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনেক ছাপাখানার মালিক। অনেকের সক্ষমতা তিন ভাগের এক ভাগ কাজও পাচ্ছেন না। আবার অনেকে সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ কাজ পাচ্ছেন। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া উচিত।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির নির্দেশনায় ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকের গুণমান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গতকাল বিকালে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মো. আবু নাসের টুকু। এতে ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির স্বত্বাধিকারী শেখ বেলাল হোসাইন বলেন, পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। সঠিকভাবে যাচাই করেই কাগজের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।
সম্পাদক : ডা. সেলিম রেজা
কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ