প্রিন্ট এর তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মবের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে
||
সারা দেশ মবের আতঙ্কে ছেয়ে যাচ্ছে। মব সন্ত্রাস আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো গণপিটুনির ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ ও নাগরিক মনস্তত্ত্বের গভীরে ঢুকে পড়া এক ভয়ংকর প্রবণতা। সন্দেহভাজন চোর কিংবা অপরাধী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সংখ্যালঘু, শিক্ষক, সাংবাদিক, সুফি, মুক্তমনা, সংস্কৃতিকর্মী কেউই যেন মবের রোষানল থেকে নিরাপদ নয়। আইনের যথাযথ প্রয়োগ মানুষের পাশবিকতাকে দমন করার প্রধান উপায়। আর আইনের প্রয়োগ না হলে জনগণ বেপরোয়া হয়ে যা ইচ্ছা, তা-ই করতে পারে। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে আইনকে পাশ কাটিয়ে একটি গোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের হাতে বিচার তুলে নেওয়াকে স্বাভাবিক বলে ভাবতে শুরু করেছিল। নতুন সরকার গঠনের পরও সেটি বন্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সে সময় মবের ঘটনাগুলোর পেছনের কারণ ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক গুজব, ভিন্ন মতকে দমন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের না দেখার ভানকে অস্বীকার করা যাবে না।
২০২৪ সালের আগস্টে যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তার বারুদ এক দিনে তৈরি হয়নি। রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতিবাদ ন্যায়সংগত হতে পারে। তার পরিণতিতে কোনো নাগরিককে হত্যা, বাড়িঘরে হামলা কিংবা প্রতিহিংসার বশীভূত হয়ে কারও মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলা—এগুলো কোনোভাবেই ন্যায়বিচার ছিল না। তৌহিদি জনতার ব্যানারে দেশের মাজার ও খানকাগুলো ভাঙা হয়েছিল। ইসলামবিরোধী অপবাদ দিয়ে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকার নীরব ছিল।
পুলিশ সদস্যদের হত্যা করায় বহু পুলিশ সদস্য কর্মস্থল ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তৈরি হয় শূন্যতা। রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, তখন জনতা শক্তিশালী হয় না; শক্তিশালী হয় জনতার ভেতর লুকিয়ে থাকা সংগঠিত সহিংস গোষ্ঠী। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়লে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য জনতার আবেগকে ব্যবহার করে। এখানেই চব্বিশের পরের বাংলাদেশে মব রাজনীতির নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব সহিংসতায় ১২৮ জন নিহত হন। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৭-এ। এক বছরের ব্যবধানে নিহতের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৩৪ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হন।
মব সন্ত্রাস এখন সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি ভয়ংকর রূপ নিল কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর হবে বিচারহীনতা। ৫ আগস্টের পর যারা প্রতিশোধের নামে মানুষ হত্যা করেছে কিংবা পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে, তারা এই সংস্কৃতির নির্মাতা।
অন্তর্বর্তী সরকার কি দায় এড়াতে পারে? সহজ করে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার মব সন্ত্রাসের দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। ৫ আগস্টের পর যে সরকার দায়িত্ব নেয়, তাদের সামনে ছিল একটি ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ। কিন্তু তখন মব সহিংসতা বন্ধ করা যায়নি; বরং আরও বেড়েছে। বর্তমান সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান নিজে অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মবকে ভীষণভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে।
অনলাইন গুজব ও সহিংসতার আহ্বান বাস্তব হামলাকে উসকে দিয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে ‘ধর্মদ্রোহী’, ‘দেশদ্রোহী’ ঘোষণার পর জনতা প্রথমে তাকে হত্যা করে। পরে কারণ খোঁজে। মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নীতিনির্ভর না হয়ে সুবিধানির্ভর হয়ে উঠেছে। নিজের কর্মী আক্রান্ত হলে দল প্রতিবাদ করে। প্রতিপক্ষ আক্রান্ত হলে অনেক সময় নীরব থাকে। এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা। যে দল আজ মবের শিকার, কাল সে দলই যদি ক্ষমতায় গিয়ে একই কৌশল ব্যবহার করে, তাহলে রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়ে শুধু মবের মালিকানা বদলাবে। মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান হতে হবে দলনিরপেক্ষ। মবের আসল শক্তি সংখ্যায় নয়, বিচারহীনতার অনাস্থায়। একজন মানুষ একা কাউকে হত্যা করতে ভয় পায়। সে যখন দেখে আগেও অনেকে মব হামলা করে পার পেয়ে গেছে, তখন তার ভয় কমে যায়। সেখানেই জন্ম নেয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। মবের জন্মদাতা শুধু উচ্ছৃঙ্খল জনতা নয়। মবের জন্মদাতা হলো রাষ্ট্রের দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং সর্বোপরি বিচারহীনতা।
সবকিছুর ওপরে যে সত্যটি দাঁড়িয়ে আছে, তা হলো মব সন্ত্রাস কোনো বিপ্লবের সন্তান নয়। এটি রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বিচারহীনতার যৌথ সন্তান।
প্রশ্ন হলো, মব সন্ত্রাসের জন্ম কে দিয়েছে? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে হবে, কে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে? জন্মের দায় ইতিহাসের, কিন্তু বেঁচে থাকার দায় বর্তমানের। মব রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিচার করছে, ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করছে। একসময় সে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও দাঁড়াবে। তখন রাষ্ট্রের হাতে আইন থাকলেও প্রয়োগের কর্তৃত্ব থাকবে না। সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশ কি আদালতের রাষ্ট্র থাকবে, নাকি রাস্তার জনতার রায়ের রাষ্ট্রে পরিণত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতে হবে। মব যখন কাউকে হত্যা করে, তখন রাষ্ট্রের আইনের শাসনেরও একটি অংশ মারা যায়। আর সেই হত্যার বিচার না হলে, পরবর্তী মব আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। মবকে পরাজিত করার একমাত্র পথ হলো রাষ্ট্রকে আইনের কাছে ফিরিয়ে আনা।
লেখক: সাংবাদিক
সম্পাদক : ডা. সেলিম রেজা
কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ