প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সোনারগাঁয়ে চিকিৎসকের ‘উগ্র’ আচরণে রোগীর কান্না
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক নারী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার, রূঢ় আচরণ এবং যথাযথ চিকিৎসাসেবা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ফারজানা আক্তারের কথিত আচরণে মো. মনির হোসেন নামে এক রোগী হাসপাতালের বারান্দায় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসে এমন আচরণের শিকার হওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।অসুস্থ মানুষ সাধারণত হাসপাতালের দ্বারস্থ হন চিকিৎসা, সহানুভূতি ও একটু মানবিক আচরণের প্রত্যাশায়। কিন্তু সেই হাসপাতালেই যদি একজন রোগী চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিজেকে অপমানিত ও অসহায় মনে করেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় একজন রোগীর মর্যাদা ও মানবিক অধিকার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে?ভুক্তভোগী মনির হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, পায়ের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও ক্ষতজনিত সমস্যায় তিনি রোববার সকালে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে যান। সেখান থেকে তাকে বহির্বিভাগে সার্জারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়। নিয়ম অনুযায়ী টিকিট সংগ্রহ করতে গেলে তিনি জানতে পারেন, নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ায় টিকিট কাউন্টার বন্ধ হয়ে গেছে।নিরুপায় হয়ে বিষয়টি চিকিৎসক ডা. ফারজানা আক্তারকে জানাতে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন মনির। তার দাবি, চিকিৎসক তাকে একজন নিরাপত্তাকর্মী সঙ্গে নিয়ে আসতে বলেন। পরে নিরাপত্তাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করলে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসক ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন।মনির হোসেনের অভিযোগ, তিনি অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসা ও সহযোগিতার আশায় চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি এমন রূঢ় আচরণের মুখোমুখি হন, যা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। একপর্যায়ে হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।মনিরের বক্তব্য, “আমি অসুস্থ ছিলাম। চিকিৎসা পাওয়ার আশায় হাসপাতালে গিয়েছিলাম। একজন চিকিৎসকের কাছে মানুষের মতো ব্যবহার পাওয়াটাই তো স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু আমার সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে, যা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।”এদিকে সাংবাদিক মাসুদ রানা তাঁর ভাইয়ের চিকিৎসা করানোর জন্য সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেও ডা. ফারজানা আক্তারের কথিত দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, ভাইয়ের চিকিৎসার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শের জন্য চিকিৎসকের কাছে গেলে তার সঙ্গেও রূঢ় ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। একজন সাংবাদিক হিসেবে নয়, একজন অসুস্থ স্বজনকে চিকিৎসা করাতে আসা সাধারণ একজন মানুষের মতোই তিনি চিকিৎসকের কাছ থেকে সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ প্রত্যাশা করেছিলেন বলে জানান মাসুদ রানা।মাসুদ রানার অভিযোগ, রোগীর স্বজন হিসেবে চিকিৎসকের কাছে প্রয়োজনীয় বিষয় জানতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও অপমানজনক মনে হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়েও চিকিৎসকের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা হাসপাতালে উপস্থিত হন। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় ডা. ফারজানা আক্তার নিজের কক্ষের দরজা বন্ধ করে রাখেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর দরজা খোলা হলেও সংবাদকর্মীদের সঙ্গে তিনি অসৌজন্যমূলক ও অপেশাদার আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, চিকিৎসক ডা. ফারজানা আক্তারের বিরুদ্ধে রোগী ও অন্যদের সঙ্গে রূঢ় আচরণের অভিযোগ আগেও উঠেছে। সাংবাদিক মাসুদ রানা তাঁর ভাইয়ের চিকিৎসা করাতে এসে একই ধরনের আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। সাংবাদিক হিরো মিয়ার সঙ্গেও একই ধরনের আচরণের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই ছাড়া সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তাই আগের অভিযোগগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।একজন রোগী ভুল করতে পারেন, হাসপাতালের নিয়ম-কানুন না-ও জানতে পারেন কিংবা নির্ধারিত সময়ের পরে টিকিটের জন্য আসতে পারেন। কিন্তু অসুস্থ একজন মানুষকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলা, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া এবং মানবিক আচরণ করা স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগীই আর্থিক ও সামাজিকভাবে অসচ্ছল। তাদের কাছে একজন চিকিৎসকের সহানুভূতিশীল আচরণ অনেক সময় ওষুধের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। একই সঙ্গে ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। ফলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী একজন নাগরিকের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক আচরণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।ঘটনার প্রকৃতি ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যদি কারও ওপর শারীরিক আঘাত বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩২৩ বা ৩৫২ ধারাসহ সংশ্লিষ্ট আইন বিবেচনায় আসতে পারে। তবে বর্তমানে এসব ধারায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। ঘটনার প্রকৃত সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের।এ ছাড়া চিকিৎসকের পেশাগত আচরণ নিয়ে অভিযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর অধীনে পেশাগত অসদাচরণ সংক্রান্ত বিধানও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।এ বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) জানান, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। তিনি ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।তদন্তের ক্ষেত্রে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, উপস্থিত রোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য এবং ভুক্তভোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।তবে একই সঙ্গে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বক্তব্যও জনসম্মুখে আসা জরুরি। কারণ অভিযোগের পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য প্রকাশ করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি। ডা. ফারজানা আক্তারের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগটি কোনোভাবেই ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। একজন রোগী যদি সত্যিই চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে অপমানিত হয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। আবার অভিযোগের সত্যতা না থাকলে চিকিৎসকের বিরুদ্ধেও যেন অন্যায় বা ভিত্তিহীন সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।কারণ হাসপাতাল শুধু চিকিৎসা দেওয়ার স্থান নয়; অসহায় ও অসুস্থ মানুষের কাছে এটি অনেক সময় শেষ আশ্রয়স্থল। একজন রোগী যখন ব্যথায় কাতর হয়ে চিকিৎসকের দরজায় দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু ওষুধ চান না—চান একটু সহানুভূতি, একটু সম্মান এবং মানুষ হিসেবে তার মর্যাদাটুকু।হাসপাতালের বারান্দায় একজন অসুস্থ মানুষের কান্না তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত কষ্টের ঘটনা নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মানবিকতা ও জবাবদিহির প্রতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ডা. ফারজানা আক্তারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা হবে। অভিযোগ সত্য হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অভিযোগ অসত্য হলে চিকিৎসকের অধিকার ও সম্মানও সুরক্ষিত থাকবে। ভবিষ্যতে কোনো রোগী কিংবা রোগীর স্বজন যেন চিকিৎসা নিতে এসে অপমান, অবহেলা কিংবা অসহায়ত্বের শিকার না হন—এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।পরি-কন্ঠ/মুয়াজ
সম্পাদক : ডা. সেলিম রেজা
কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ