প্রিন্ট এর তারিখ : ৩১ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬
কোরআনের প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপির রহস্যময় ইতিহাস
ড. মোহাম্মদ সেলিম রেজা ||
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত প্রাচীন কোরআনের একটি পাণ্ডুলিপি নতুন করে আন্তর্জাতিক গবেষক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রেডিওকার্বন ডেটিং বিশ্লেষণে গবেষকদের ধারণা, এই পাণ্ডুলিপির চামড়া মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশা অথবা তাঁর ইন্তেকালের অল্প সময় পরের, অর্থাৎ ৫৭০ থেকে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যকার সময়ের। ফলে এটি ইসলামের প্রাথমিক যুগে কোরআনের লিখিত সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।গবেষকদের মতে, কোরআনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপির ইতিহাস কেবল আধুনিক কোনো আবিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংরক্ষিত ও উদ্ধার হওয়া পাণ্ডুলিপিগুলো ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে আসছে।গবেষক মনির ইউসুফ তাহা তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত দুই পাতার এই পাণ্ডুলিপি হিজরি প্রথম শতকের বা মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশার খুব কাছাকাছি সময়ের হতে পারে। তাঁর মতে, এটি কোরআনের পাঠ সংরক্ষণের ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতাকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে।এদিকে মিসরে আবিষ্কৃত হিজরি ২২ সালের (৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) দুটি আরবি প্যাপিরাস থেকেও প্রমাণ মেলে যে ইসলামের সূচনালগ্নেই আরবি ভাষা প্রশাসনিক ও সামাজিক কাজে সুসংগঠিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। একটি প্যাপিরাসে কর আদায়ের হিসাব এবং অন্যটিতে মুসলিম সেনাবাহিনীর জন্য ভেড়া সরবরাহের বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব দলিল প্রমাণ করে যে প্রথম হিজরি শতকেই লিখিত নথি সংরক্ষণের একটি সুদৃঢ় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।কোরআনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১৮৬৯ সালে, যখন মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক নগরী সমরখন্দে একটি বিরল ও বিশালাকার কোরআনের পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করা হয়। পরে রুশ সাম্রাজ্যের তুর্কিস্তানের গভর্নর জেনারেল কার্ল ফন কফম্যান এটি সেন্ট পিটার্সবার্গের ইম্পেরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন।মিসরের ঐতিহাসিক সাময়িকী আল-ইখা-তে ১৯২৮ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পাণ্ডুলিপিটি বহু শতাব্দী ধরে তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ‘মুসহাফে উসমানী’ হিসেবে পরিচিত ছিল। রুশ ইম্পেরিয়াল আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটির গবেষক অধ্যাপক শেবুতিন দীর্ঘ গবেষণার পর মত দেন, পাণ্ডুলিপিটি হিজরি প্রথম শতক অথবা দ্বিতীয় শতকের সূচনালগ্নের হতে পারে। এর প্রাচীন আরবি ক্যালিগ্রাফি ও লিখনরীতি ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।তবে ইতিহাসের এক দুঃখজনক অধ্যায় হলো ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব। সে সময় রাশিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠীর দাবির মুখে সেন্ট পিটার্সবার্গে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপিটি তুর্কিস্তানে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু স্থানান্তরের পথে কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে পাণ্ডুলিপিটি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে বহু অনুসন্ধান চালিয়েও এর নিশ্চিত অবস্থান আর জানা যায়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি বিশ্ব পাণ্ডুলিপি ইতিহাসের অন্যতম বড় ক্ষতি।তবে মূল পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেলেও তার একটি মূল্যবান প্রতিলিপি ইতিহাসকে রক্ষা করে। ১৯০৪ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ আর্কিওলজিক্যাল সোসাইটির তত্ত্বাবধানে মূল পাণ্ডুলিপির হুবহু আলোকচিত্রভিত্তিক (ফ্যাকসিমিলি) সংস্করণ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরের বছর ১৯০৫ সালে বিশিষ্ট রুশ প্রাচ্যবিদ এস. পিসারেভ এটি নিখুঁতভাবে প্রকাশ করেন।৩৫৩ পৃষ্ঠার এই বিশাল সংস্করণের প্রতিটি পৃষ্ঠার আকার ছিল ৬৯×৯০ সেন্টিমিটার এবং প্রতিটি কপির ওজন ছিল প্রায় ১৮ কেজি। মাত্র ৫০টি কপি প্রকাশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২৫টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রাজকীয় সংগ্রহশালার জন্য সংরক্ষিত রাখা হয় এবং বাকি ২৫টি বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করা হয়। সে সময় প্রতিটি কপির মূল্য ছিল ১০০ পাউন্ড। প্রতিলিপির প্রথম পাতায় উল্লেখ ছিল যে এটি সমরখন্দে সংরক্ষিত খলিফা উসমান (রা.)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ঐতিহাসিক কোরআনের হুবহু প্রতিচ্ছবি হিসেবে ১৯০৫ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে মুদ্রিত হয়েছে।বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাণ্ডুলিপি, মিসরের প্রাচীন আরবি প্যাপিরাস এবং সমরখন্দের ঐতিহাসিক মুসহাফ—এসব নিদর্শন গবেষকদের কাছে ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস, কোরআনের লিখিত সংরক্ষণ এবং আরবি লিপির বিকাশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও সমরখন্দের মূল পাণ্ডুলিপির বর্তমান অবস্থান আজও রহস্যাবৃত, তবুও সংরক্ষিত প্রতিলিপি ও আধুনিক গবেষণা বিশ্বজুড়ে ইতিহাসবিদ ও পাণ্ডুলিপি গবেষকদের জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে রয়েছে।
তথ্যসূত্র: ইসলাম অনলাইন ডটকম।
সম্পাদক : ডা. সেলিম রেজা
কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ