প্রিন্ট এর তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬
সোনারগাঁও দরিকান্দি-বাংলাবাজার সড়ক সংস্কারের জরুরি দাবি
মীযানুর রহমান ||
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার দরিকান্দি থেকে বাংলাবাজার পর্যন্ত সড়কটি আজ আর শুধু একটি রাস্তা নয়—এটি এখন হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, প্রতিদিনের কষ্ট আর অবহেলার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বছরের পর বছর সংস্কারের অভাবে সড়কটি এমনভাবে নষ্ট হয়ে গেছে যে, এই পথে চলাচল করা মানেই যেন প্রতিদিন এক নতুন দুর্ভোগের মুখোমুখি হওয়া।প্রতিদিন ভোর হলেই এই রাস্তায় নামে মানুষের ঢল। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ, কারখানার শ্রমিক, বাজারের ব্যবসায়ী—সবাইকে এই একটি সড়কের ওপর নির্ভর করেই চলতে হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি এখন ভাঙাচোরা গর্ত, কাদা আর জমে থাকা পানিতে পরিণত হয়েছে এক বিপজ্জনক চলাচলের রাস্তায়।স্থানীয়দের মতে, এই সড়ক দিয়ে অন্তত ৬০ থেকে ৭০টি গ্রামের মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করেন। সড়কের পাশে রয়েছে পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, একটি ইউনিয়ন পরিষদ, চারটি কবরস্থান এবং একটি ব্যস্ত বাজার। ফলে এই পথের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের এমন করুণ অবস্থা যেন কারো নজরেই পড়ছে না।বর্ষা মৌসুম এলেই দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ডুবে যায় কাদা আর পানিতে। কোথাও কোথাও এতটাই কাদা জমে যে, পা তোলাও কষ্টকর হয়ে পড়ে। যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, আর যারা চলার চেষ্টা করেন, তাদের পড়তে হয় চরম ঝুঁকিতে।একজন শিক্ষার্থী কষ্টভরা কণ্ঠে জানায়, “স্কুলে যেতে গেলে প্রতিদিন ভয় লাগে। কখন যে পড়ে যাই! বই-খাতা নষ্ট হয়ে যায়, ইউনিফর্ম ময়লা হয়ে যায়। অনেক সময় তাই স্কুলেই যেতে মন চায় না।” এই একটি কথাই বুঝিয়ে দেয়, একটি খারাপ রাস্তা কিভাবে একটি শিশুর স্বপ্নকেও বাধাগ্রস্ত করে।শ্রমজীবী মানুষের জন্য এই সড়ক যেন প্রতিদিনের সংগ্রামের আরেক নাম। কারখানায় কাজ করা এক শ্রমিক বলেন, “সময়মতো কাজে পৌঁছাতে পারি না। অনেক সময় দেরি হয়, বকা খেতে হয়। এই রাস্তায় চলতে গিয়ে পড়ে গিয়ে আহতও হয়েছি। কিন্তু কিছুই করার নেই—এই পথেই তো চলতে হবে।”তবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন অসুস্থ রোগী ও গর্ভবতী নারীরা। স্থানীয়রা জানান, জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে গেলে এই রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স চলতে চায় না। অনেক সময় রোগীকে ভ্যানে বা কোলে করে নিয়ে যেতে হয়। এতে রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে।একজন গৃহবধূ বলেন, “ডেলিভারির সময় এই রাস্তায় চলা মানে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। অনেক নারী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না। এই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।” তার কণ্ঠে ছিল আতঙ্ক আর অসহায়ত্বের ছাপ।এই সড়কের পাশে থাকা কবরস্থানগুলোতেও মানুষের যাতায়াতে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। জানাজা বা দাফনের সময় কাদা-পানির মধ্যে দিয়ে লাশ বহন করতে হয়—যা শুধু কষ্টকরই নয়, অত্যন্ত বেদনাদায়কও।এলাকাবাসীর অভিযোগ, একাধিকবার এই সড়ক সংস্কারের দাবি জানানো হলেও এখনো পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে দিন দিন ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে মানুষের মধ্যে।এলাকাবাসী নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজারুল ইসলাম মান্নান-এর প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বিশ্বাস করেন, জনগণের এই দুর্ভোগ তিনি উপলব্ধি করবেন এবং দ্রুত এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “আমরা কোনো বিলাসিতা চাই না, শুধু একটি চলার মতো রাস্তা চাই। এই রাস্তাটা ঠিক হলে আমাদের জীবন অনেক সহজ হয়ে যাবে।”সচেতন মহলের মতে, একটি এলাকার উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো তার যোগাযোগ ব্যবস্থা। অথচ দরিকান্দি থেকে বাংলাবাজার সড়কের এমন বেহাল অবস্থা শুধু জনজীবনই ব্যাহত করছে না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।এই বাস্তবতায় এলাকাবাসীর একটাই দাবি—অবিলম্বে এই সড়কটির সংস্কার কাজ শুরু করা হোক। আর দেরি নয়, এখনই প্রয়োজন দৃশ্যমান উদ্যোগ।কারণ, এই সড়ক শুধু মাটি আর পিচের সমষ্টি নয়—এটি হাজারো মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অংশ, তাদের স্বপ্ন, তাদের নিরাপত্তা, তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। তাই এই দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে এখনই প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আর কার্যকর পদক্ষেপ।
সম্পাদক: ড. মোঃ সেলিম রেজা
প্রকাশক: মীযানুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ