প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
তুচ্ছ বিরোধের জেরে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে পেটে লাথি, যুবককে কুপিয়ে রক্তাক্ত যখম
||
মানুষের মধ্যে মতবিরোধ হতে পারে, তর্ক-বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু সেই বিরোধের পরিণতি যদি একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর পেটে লাথি মারা এবং এক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করার মতো ভয়াবহ ঘটনায় গড়ায়, তাহলে তা শুধু একটি অপরাধ নয়, মানবতার ওপরও নির্মম আঘাত।নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সনমান্দী ইউনিয়নের গিরদান গ্রামে এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। গত ৫ জুন রাত আনুমানিক ১০টা ৩০ মিনিটে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারী সুমি আক্তার এবং আলমগীর (পিতা: আব্দুছ ছাত্তার) নামে এক ব্যক্তি।স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, সামান্য বিষয় নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে কয়েকজন ব্যক্তি ক্ষিপ্ত হয়ে হামলা চালায়। হামলাকারীরা কোনো মানবিকতা কিংবা সহমর্মিতার পরিচয় না দিয়ে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা সুমি আক্তারের পেটে সজোরে লাথি মারে। হঠাৎ এই নির্মম আঘাতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।পরিবারের সদস্যরা জানান, সুমি আক্তার বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থা উদ্বেগজনক। চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। অনাগত শিশুর সুস্থতা নিয়েও পরিবার চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে।এদিকে হামলার সময় আলমগীরকে পেছন দিক থেকে ধারালো রঁদা দিয়ে মাথায় কোপ দেওয়া হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে স্বজন ও স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তার মাথায় ১০টি সেলাই দেন।ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, নজরুল, আমিরুল ও ছাইফুল (পিতা: কাদির) এই হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তারা সংঘবদ্ধভাবে নারী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে মারধর করে।ঘটনার ভয়াবহতা দেখে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রক্তের আলামত এবং হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র দেখে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হয়।পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে হামলায় ব্যবহৃত রক্তমাখা রঁদা, লোহার রড ও একটি শাবল জব্দ করে থানায় নিয়ে যায়। জব্দকৃত এসব আলামতকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।ঘটনার পর থেকেই এলাকায় চরম উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একজন গর্ভবতী নারীর ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যে সমাজে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীও নিরাপদ নন, সেই সমাজের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।এলাকাবাসীর ভাষ্য, "তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন বর্বর হামলা আমরা আগে দেখিনি। একজন মা হওয়ার অপেক্ষায় থাকা নারীর পেটে লাথি মারা শুধু অপরাধ নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য কাজ।"সচেতন মহল মনে করছে, এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা না হলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়বে। তারা প্রশাসনের প্রতি দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।বর্তমানে আহতরা চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর কান্না, একজন বৃদ্ধের রক্তাক্ত মাথা এবং একটি অনাগত শিশুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ— গিরদান গ্রামের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, সামান্য ক্রোধ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ কখনোই মানুষের মানবিকতাকে হার মানাতে পারে না। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে এমন নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে।
সম্পাদক : ডা. সেলিম রেজা
কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ