প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬
পীযূষ কুমার বিশ্বাস , বিশেষ প্রতিনিধি ||
দেশব্যাপী বৃক্ষনিধন রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ও পুনর্বনায়নের ওপর জোর দেওয়ার আহবান। বাংলাদেশে পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষ ও বনভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ, নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং অন্যান্য কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্বেগজনক হারে বৃক্ষনিধন ও বন উজাড়ের ঘটনা ঘটছে। এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার ৪ জুন, ২০২৬ তারিখে দেশের সাম্প্রতিক বৃক্ষনিধনের চিত্র, প্রবণতা ও প্রভাব তুলে ধরতে আজ রাজধানীর আগারগাঁওস্থ পরিবেশ অধিদপ্তরের কনফারেন্স রুমে “গাছ নিধন মিডিয়া মনিটরিং ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ২০২৫-২৬” শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)-এর গবেষণায় এই তথ্য উঠে আসে। অনুষ্ঠানের সূচনাপর্বে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন শুভাষীস দাস শুভ, গবেষক, রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)। গবেষণা প্রতিবেদন (কিনোট) উপস্থাপন করেন মোঃ আমিনুর রসুল, গবেষক দলের উপদেষ্টা সদস্য, ফেলো ও ট্রেজারার, রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. মোঃ লুতফুর রহমান, মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব), পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোঃ জিয়াউল হক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর। আলোচনা অংশগ্রহণ করেন মিহির বিশ্বাস, সমন্বয়ক, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন; এহসান রনি, প্রতিষ্ঠাতা, গ্রিন সেভারস; মোস্তফা কামাল মজুমদার, এডিটর, গ্রিন ওয়াচ; হুমায়ন কবির সুমন, গ্রিনভয়েস; রফিকুল ইসলাম আজাদ, সাবেক সভাপতি, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি; খোন্দকার রেবেকা সান ইয়াত, নির্বাহী পরিচালক, ক্যাপ; এবং গোলাম ইফতেখার মাহমুদ, চিফ এডিটর, ঢাকা স্ট্রিম। সভা সঞ্চালনা করেন নিখিল চন্দ্র ভদ্র, সমন্বয়ক, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন।গত চার বছর ধরে প্রতিবছর ধারাবাহিক ভাবে আরডিআরসি গাছ কাটার রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে। এবছর গবেষণা প্রতিবেদনে এপ্রিল ২০২৫ থেকে এপ্রিল ২০২৬ সময়কালে দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বৃক্ষনিধন ও বন উজাড়সংক্রান্ত সংবাদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত গাছ কাটার ঘটনা, উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বৃক্ষ অপসারণ, বনভূমি ধ্বংসের প্রবণতা এবং এর পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। আরডিআরসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন জীববৈচিত্র্য হ্রাস, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মাটিক্ষয়, জলাধার ও বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৫২,৩৭৫টি গাছ নিধনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরের ১,৮১,৮১৮টি গাছ নিধনের তুলনায় ৭১.২ শতাংশ কম। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বৃক্ষনিধনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে খুলনা (৮৫,০০০টি) ও লক্ষ্মীপুর (১৫,২৪২টি) জেলায় সর্বাধিক গাছ কাটার ঘটনা নথিভুক্ত হলেও, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রাজশাহী (২৩,০৪১টি) ও কক্সবাজার (১১,০০০টি) জেলায় সর্বাধিক বৃক্ষনিধনের তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষনা রিপোর্টে বন বিভাগ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কাঠ ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বৃক্ষনিধনের অভিযোগ উঠে এসেছে। অন্তর্বতী সরকার সময়ে বন পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের আওতায় ৫,০৯৩ একর দখলকৃত বনভূমি পুনরুদ্ধার ও পুনর্বনায়ন করা হয়। এছাড়া সোনাদিয়া দ্বীপে ৯,৪৬৭ একর, কক্সবাজারে ৭০০ একর এবং অন্যান্য এলাকাসহ মোট প্রায় ২,৮০,৪৩৮ একর বনভূমি পুনরুদ্ধার বা সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সম্প্রসারণ প্রকল্পে গাছ না কেটে বিকল্প নকশা গ্রহণের নির্দেশনা দেন, যার ফলে প্রায় ৩,০০০ গাছ রক্ষা পায়। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি), গ্রীনভয়েস, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন এবং ন্যাশনাল ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাকশন ফোরাম। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মোঃ লুতফুর রহমান বলেন, আমাদের পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশ দিবসে প্রথম কাজই হচ্ছে বৃক্ষরোপণ অভিজান শুরু করা।প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ দিবসে ডুলাহাজরা থেকে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির সুচনা করবেন।পরিবেশ মন্ত্রণালয় শতবর্ষী গাছ বাচিয়ে কাবর্ন নিস্ব:রন এর প্রভাব থেকে আমাদের দেশকে রক্ষা করতে পারবো।এই রকম মনিটরিং রিপোর্ট এর মত কাজের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃষ্টি করা সম্ভব। প্রধান বক্তা মোঃ জিয়াউল হক প্রতিবেদনের গুরুত্ব তুলে ধরে বৃক্ষ নিধন রোধে সকলের সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানান। এ সময় তিনি সরকারের প্রণীত বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন, ২০২৬-এর বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি যুব সংগঠন, পরিবেশবিদ, সরকারি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মিহির বিশ্বাস, সমন্বয়ক, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন বলেন,আমরা অন্ধকারে আছি। এই রিপোর্টই বলে দেয় কত গাছ কাটা হলো কত গাছ লাগানো হলো। আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে গাছ কাটা হতো। সকলের সম্মেলিত অংশগ্রহণ এর মাধ্যমেই এই ঢাকাকে সবুজ করা সম্ভব। প্রতিবেদনে বন ও বৃক্ষসম্পদ সংরক্ষণে নয়টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। ১) বন আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা ২) জাতীয় বন ও বৃক্ষনিধন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ৩) টেকসই কৃষি ও কৃষিবনায়ন সম্প্রসারণ ৪) নগর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত করা ৫) ব্যাপক বৃক্ষরোপণ ও পুনর্বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ ৬) জনসচেতনতা ও পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করা ৭) আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা ৮) বিকল্প জীবিকা ও আয়বর্ধক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা ৯) আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।