প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
‘কষ্টের ফসল অহনো পানির তলে, কাটবার মানুষ পাই না’
||
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন ও অষ্টগ্ৰাম উপজেলার বিভিন্ন হাওরে এখনও প্রায় দেড়শ হেক্টর ধানের জমি পানির নিচে রয়েছে বলে কৃষকদের দাবি। তারা বলছেন, সব মিলিয়ে ৮০ ভাগের মতো ধান কাটা শেষ হয়েছে।
তবে সরকার বলছে ভিন্ন কথা। কৃষি অফিসের তথ্যমতে, মিঠামইন উপজেলায় ৯৬ শতাংশ ও অষ্টগ্রামে ৯৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে।
এদিকে, চার দিন মোটামুটি রোদ থাকলেও গতকাল শুক্রবার দুপুরের পর আবার বৃষ্টি হয়েছে। নদীর পানি বেড়ে আবার হাওরে প্রবেশ করছে।
কৃষকরা জানান, হাওরের বিভিন্ন খাল খনন না করায় এসব খাল জমিতে পরিণত হয়েছে। অষ্টগ্রামের হাওরে জোয়াইরা খাল ও কাটা খাল বন্ধ হয়ে গেছে। এ দুটি খালের কারণে অধিকাংশ জমি পানির নিচে।
মিঠামইন উপজেলার চমোকপুরের কৃষক ইসলাম উদ্দিন জোয়াইরা বিলে আট একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। তাঁর জমি এখনও পানির নিচে। শ্রমিকের অভাবে ধান কাটতে পারেননি। গতকাল শুক্রবার সকালে চমোকপুরের হাওরের রাস্তায় দেখা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘৮ খানি ক্ষেত করছি, সবওই পানির তলে। ক্ষেতের ধারে গাড়ি যায় না, ক্ষেত কাটবার দাওয়ালও পাই না, আমার সব শেষ, আমি মাইনষেরে কইছি তোমরা আমার ক্ষেত কাইট্টা আধা লইয়া যাও, এরপরেও কেউ যায় না। এক খানি ক্ষেত কাটলে একজন কামলারে ২৫০০ টেহা দেওন লাগব। ছয়জন কামলা লইলে ১৫ হাজার টেহা দেওন লাগব। সারা বছরের খোড়াক, মহাজনের শোধের টেহা কইত্তেন দিমু।’
এই কৃষক আরও বলেন, তার আশপাশে বেলাবরের আড্ডা, কাজাগড়িয়া ও নদারের হাওরে এখনও শতাধিক একর জমি পানির নিচে রয়েছে। কাটার কোনো ব্যবস্থা নেই।
জোয়ায়রা বিলে গিয়ে পানির নিচে জমি তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়েছে। সেখানে কথা হয় কয়েকজন ভুক্তভোগী কৃষকের সঙ্গে। তাদের মধ্যে কাঞ্চন মিয়ার বাড়ি খলাপাড়া গ্ৰামে। তিনি বলেন, ‘এক খানি ক্ষেত করছি। পানির তলে ক্ষেতের ধান অহনো রইছে, কাটবার মানুষ পাই না। একজন কামলারে ২৫০০ টেহা নাইলে তিন মণ ধান দেওন লাগব ক্ষেত কাটলে। এ ক্ষেত কাটলে কামলার টেহাও হইতো না। সারা বছর কেমনে চলমু, ঋণ করছিলাম ক্ষেত করবার সময়।’
একই ধরনের কথা বললেন কৃষক জিরন মিয়া। তিনিও জোয়াইরা বিলে পাঁচ একর জমিতে ধান চাষ করেছেন, এখনও পানির নিচে রয়েছে সেগুলো। একই হাওরের আরেক কৃষক তাজিন মিয়া বলেন, ‘আমি ৪ একর ৫০ শতাংশ জমিতে ধান চাষ করেছি। জমি লাগানো শুরু করে কাডার আগ পর্যন্ত ঋণের ওপরে জমি করছি। হেই জমি এখন পানির নিচে। মেশিনেও কাডে না, দাওয়ালরাও একজনে আড়াই হাজার টেহার কমে জমি কাটত না।’
বল্লি বিলের কৃষক খলাপাড়া গ্ৰামের সালাউদ্দিন মিয়া বলেন, ‘৩ একর জমি পানির নিচে, কাডার মতো ব্যবস্থা নাই। দিন-রাইত খাইয়া না খাইয়া পইড়া রইছি হাওরে, একমুট ভাতের লাগি।’
চমোকপুর সেচ স্কিমের ম্যানেজার রুবেল মিয়া বলেন, ‘জোয়াইরা বিলে চার একর জমি পানির নিচে রয়েছে। মনে হয় আর কাটতে পারব না। গাড়ি যায় না, হারভেস্টারও যায় না।’
নদার হাওরের দুই কৃষক কবির ও মজিদ মিয়া বলেন, দুজনে চার একর জমি করছিলাম মহাজনের কাছ থেইক্কা শোধি টেহা আইন্না। এক মুট ধানও কাটতাম পারছি না সব পানির তলে। অহন নিজেরা কী খাইমু, কেমনে ঋণ দিমু, হেই চিন্তায় ঘুম হয় না। গরুরও খাওন নাই। চারটা গরু বেইচ্চা দিমু।
অষ্টগ্রাম উপজেলার কাস্তুল ইউপির এক নম্বর ওয়ার্ড সদস্য খসরু মিয়া বলেন, ‘২৫ একর জমিতে ধান চাষ করেছি। মাত্র ১৪ একর কাটতে পেরেছি। বাকি জমি পানির নিচে। এ ছাড়া খলায় পানি জমে কাটা ধানে ও গ্যাজ উঠে পড়েছে। অলওয়েদার সড়ক থাকায় ধান শুকাতে পারছি। আমাদের গ্ৰামটি সড়ক থেকে নিচু। এ জন্য খলায় পানি জমে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’
জানতে চাইলে মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম অপু বলেন, উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় তিন হাজার ৬৮৮ জনের নাম এসেছে। ক্ষতি হয়েছে ৮৯৬ হেক্টর জমির। কাটা হয়েছে ৯৬ শতাংশ। তিনি আশা করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে শতভাগ কাটা শেষ হবে। তবে কোনো কোনো জায়গায় শ্রমিকের অভাবে তলিয়ে যাওয়া ধান কৃষকরা কাটতে পারছেন না। পানির মধ্যে হারভেস্টারও ধান কাটতে পারে না।
অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ পণ্ডিত বলেন, উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ছয় হাজার ৯৯৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম তালিকায় এসেছে। এ পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ মোট তিন হাজার ১৭৪ হেক্টর জমি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান বলেন, জেলার প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইটনা ও অষ্টগ্ৰাম উপজেলা। মিঠামইনে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম।
সম্পাদক : ডা. সেলিম রেজা
কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ