প্রিন্ট এর তারিখ : ১৪ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও প্রোগ্রামিং শিক্ষা
||
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং প্রোগ্রামিং শিক্ষা বিস্তারে কাজ করছেন সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তা সুমিত সাহা। বহুজাতিক ব্র্যান্ডের জন্য এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার সলিউশন তৈরি থেকে শুরু করে মাতৃভাষায় প্রোগ্রামিং শিক্ষাকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে তিনি ভূমিকা রাখছেন। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানালাইজেনের’ সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং মাতৃভাষায় প্রোগ্রামিং শেখার প্ল্যাটফর্ম ‘লার্ন উইথ সুমিতের’ প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।
শিক্ষাজীবন ও উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা
সুমিত সাহা ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রংপুর জিলা স্কুল ও ঢাকার নটরডেম কলেজে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করার পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
২০০৮ সালের আগস্ট মাসে, বুয়েটে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি তার সহপাঠী রিদওয়ান হাফিজের সঙ্গে মিলে ‘অ্যানালাইজেন’ প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুর দিকে তিনি ফ্রিল্যান্সিং মডেলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের জন্য সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তার এ উদ্যোগ প্রযুক্তি-নির্ভর ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন ভিডিও কন্টেন্ট এবং ডেটা-ড্রিভেন ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্টের দিকে বিস্তৃত হয়। ২০১৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অ্যানালাইজেন বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামে নিবন্ধিত করেন। বৈদেশিক বিনিয়োগ ছাড়াই সুমিত সাহা তার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দেশের বাইরে সম্প্রসারণ করেছেন, যার অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে সিঙ্গাপুরে, পরবর্তীতে মিয়ানমারে এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে কানাডায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেন।
সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও নকশা নিবন্ধন
অ্যানালাইজেনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সুমিত সাহা প্রতিষ্ঠানের কারিগরি পণ্য উন্নয়নে নেতৃত্ব দেন। তাদের তৈরি সফটওয়্যারগুলোর মধ্যে প্রধান তিনটি হলো: ক্ষুদ্রঋণ খাতের জন্য ডিজিটাল লেন্ডিং প্ল্যাটফর্ম ‘মাইক্রোজেন’, এআই-ভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টুল ‘লিসেনাইজেন’ এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় বিক্রয়প্রক্রিয়ার সলিউশন ‘কমজেন’।
সম্প্রতি ২০২৬ সালে সুমিত সাহার তৈরি ক্ষুদ্রঋণ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার একটি ডেটা প্রসেসিং ইন্টারফেসের নকশা যুক্তরাজ্যের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অফিসে (ইউসে আইপিও) নিবন্ধিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ওয়েবসাইটে নিশ্চিত হওয়া গেছে। “Data Processing Device Interface for Microfinance Loan Assessment” শিরোনামের এ নকশার ইউকে রেজিস্টার্ড ডিজাইন নম্বর ৬৫০৮২৮০। এ ডিজিটাল ইন্টারফেসটি মাইক্রোফাইন্যান্স খাতে গ্রাহকদের ঋণ মূল্যায়নের ডেটা বিশ্লেষণ ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার কাজে ব্যবহৃত হয়।
স্বীকৃতি ও পুরস্কার
২০১৯ সালে ‘বেসিস ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ডসের’ সুমিত সাহার নেতৃত্বে উদ্ভাবিত সফটওয়্যারগুলো তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন পুরস্কার অর্জন করে। এ প্রতিযোগিতায় সফলতার মাধ্যমে তিনি একই বছর ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক আইসিটি অ্যালায়েন্স বা ‘অ্যাপিকটা’ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ডিজিটাল এজেন্সি হিসেবে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে ‘ক্যাম্পেইন এশিয়া-প্যাসিফিক’ থেকে তার পরিচালিত প্রতিষ্ঠান অ্যানালাইজেন ‘ডিজিটাল এজেন্সি অব দ্য ইয়ার (রেস্ট অব সাউথ এশিয়া)’ ক্যাটাগরিতে রৌপ্য পদক লাভ করে। এছাড়া ২০২৫ সালের বাংলাদেশ ফিনটেক অ্যাওয়ার্ডে তার উদ্ভাবিত ক্ষুদ্রঋণ প্ল্যাটফর্ম ‘মাইক্রোজেন’ সম্মানসূচক স্বীকৃতি (Honorable Mention) লাভ করে।
‘লার্ন উইথ সুমিত’ ও প্রোগ্রামিং শিক্ষা
প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষার ভীতি দূর করতে এবং প্রোগ্রামিংয়ের মৌলিক বিষয়গুলো সহজলভ্য করতে ২০২০ সালে সুমিত সাহা ‘লার্ন উইথ সুমিত’ উদ্যোগটি শুরু করেন। মূলত জাভাস্ক্রিপ্ট, রিয়্যাক্ট, টাইপস্ক্রিপ্ট, নোড জেএস এবং নেক্সট জেএসের মতো অ্যাডভান্সড বিষয়গুলোর ওপর শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে তিনি মাতৃভাষায় প্রোগ্রামিং শিক্ষাকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
২০২১ সালে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কাঠামোগত করার জন্য তিনি ‘লার্ন উইথ সুমিত’ উদ্যোগের অধীনে নিজস্ব লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) চালু করেন। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ‘লার্ন উইথ সুমিত’ ইউটিউব চ্যানেলে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক ৫০০-এর বেশি লেকচার ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে এবং বর্তমানে চ্যানেলটির সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১ লাখ ৮৪ হাজার ছাড়িয়েছে বলে চ্যানেলটিতে সরাসরি দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ও অবদান
সুমিত সাহা আন্তর্জাতিক অলাভজনক ডেভেলপার শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম ‘ফ্রি-কোড-ক্যাম্পের’ সঙ্গে কন্ট্রিবিউটর হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। ২০২৫ সালে তিনি এই প্ল্যাটফর্মের জন্য Node.js-এ ‘মাল্টি-থ্রেডিং’ এবং ‘মডেল কনটেক্সট প্রোটোকলের’ (এমসিপি) মতো কারিগরি বিষয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। একই বছরের আগস্ট মাসে ফ্রি-কোড-ক্যাম্পের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে তার তৈরি একটি সম্পূর্ণ Next.js কোর্স প্রকাশিত হয়।
ফ্রি-কোড-ক্যাম্পের প্ল্যাটফর্মে তার পরিচালিত ‘গিট এবং গিটহাব’ কোর্সটি বিশ্বব্যাপী ৩ লাখেরও বেশি লার্নার সম্পন্ন করেছেন বলে প্ল্যাটফর্মটিতে উল্লেখ রয়েছে। তার এ শিক্ষামূলক কাজগুলো ফ্রি-কোড-ক্যাম্পের প্রতিষ্ঠাতা কুইন্সি লারসনের সাপ্তাহিক নিউজলেটারেও স্থান পেয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি কুইন্সি লারসন পরিচালিত আন্তর্জাতিক ‘ফ্রি-কোড-ক্যাম্প পডকাস্ট’-এ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। পডকাস্টের প্রকাশিত এপিসোড তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত তিনিই এই পডকাস্টে অংশগ্রহণকারী একমাত্র বাংলাদেশি।
এর বাইরে, একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে তার তৈরি করা একটি ভিজ্যুয়াল স্টুডিও কোড (VS Code) থিম মাইক্রোসফট মার্কেটপ্লেস থেকে ১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশিবার ইন্সটল করা হয়েছে। মাইক্রোসফট মার্কেটপ্লেসের রেটিং তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বর্তমানে এটি সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের সর্বোচ্চ রেটিংপ্রাপ্ত থিমগুলোর শীর্ষে অবস্থান করছে।
সম্পাদক : ডা. সেলিম রেজা
কপিরাইট © ২০২৬ পরিবেশ কন্ঠ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত