প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬
কেরোসিনওয়ালা: হারিয়ে যাওয়া এক পেশা
মোহাম্মদ সেলিম রেজা ||
একসময়
ঢাকার অলিগলিতে কেরোসিনওয়ালাদের পদচারণা ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য।
তাঁরা ছিলেন স্বাধীন পথ-বিক্রেতা—টিনের ক্যান বা
ঠেলাগাড়িতে কেরোসিন বহন করে দোকানের
নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা পরিবারগুলোর
দুয়ারে পৌঁছে দিতেন। সবাই
তাঁদের ডাকতেন "কেরোসিনওয়ালা", আর শিশু-কিশোরদের
কাছে তাঁরা ছিলেন স্নেহের
"কেরোসিন মামা"।
সে
সময় ঢাকায় রান্না থেকে
শুরু করে নিত্যদিনের নানা
কাজে কেরোসিনের চাহিদা ছিল ব্যাপক।
গ্রাম ও শহরে কেরোসিনের
খুচরা বিক্রয়ের মূল কেন্দ্র ছিল
মুদি দোকান ও হাটবাজার।
গৃহিণী বা শিশুরা কাচের
বোতল হাতে দোকানে তেল
কিনতে যেত—এ ছিল
কেরোসিন যুগের এক দৈনন্দিন
আচার।
১৯৭০-এর দশক থেকে
২০০০-এর দশকের গোড়া
পর্যন্ত গ্রামে সূর্যাস্তের পর
সব কাজকর্ম আবর্তিত হতো কেরোসিন বাতিকে
ঘিরে। দোকান থেকে দূরে
গ্রাম বা নদীতীরের অস্থায়ী
বসতিতে ড্রামগাড়ির ছিল অপরিহার্য ভূমিকা।
বিক্রেতারা সাধারণত স্থানীয় মুদি দোকান বা
ছোট তেলের গুদাম থেকে
পাইকারি কেরোসিন কিনে দাম বাড়িয়ে
সেই সব পরিবারকে বোতলভরে
বিক্রি করতেন, যারা দোকান
থেকে দূরে থাকতেন বা
চলাচলে অক্ষম ছিলেন।
কেরোসিন
বাতি শুধু আলোর যন্ত্র
ছিল না—হারিকেনের আলো
রাতের সব সামাজিক কার্যক্রমের
প্রাণ ছিল। গ্রামের বিয়ে,
লোকনাট্য, ধর্মীয় সমাবেশ, পারিবারিক প্রার্থনা, এমনকি শিশুদের উঠানে
বা বারান্দায় পড়াশোনাও চলত এই আলোয়।
কাচের বোতল ছিল কেরোসিন
কেনার আদর্শ পাত্র; বোতলের
মুখে দড়ি বেঁধে রান্নাঘরের
নির্দিষ্ট জায়গায় ঝুলিয়ে রাখা হতো—এই
চিত্র কেরোসিন যুগের অনেকের স্মৃতিকথায়
আজও জীবন্ত।
১৯৫০-এর দশকের ঢাকার
বাসিন্দাদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, বাতিওয়ালারা ছিলেন পৌরসভার কর্মচারী।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় মই ও তেলের
পাত্র নিয়ে তাঁরা বাতির
খুঁটির কাছে হাজির হতেন—অনেকে মইকে বলতেন
"সিঁড়ি"। মই
বেয়ে উঠে কাচের চিমনির
ছোট দরজা খুলে বাতির
পেটে কেরোসিন ঢালতেন, সলতে টেনে লম্বা
করতেন, দিয়াশলাই দিয়ে জ্বালাতেন—তারপর
এগিয়ে যেতেন পরের বাতির
দিকে। ভোরে আবার এসে
নেভাতেন ও পরিষ্কার করতেন।
কবি শামসুর রহমান "স্মৃতির
শহর" কবিতায় তাঁদের বর্ণনা করেছেন
"জাদুকর" হিসেবে—"আঙুলের এক ছোঁয়ায়,
সন্ধ্যার বোতামে আলোর কুঁড়ি
ঝুলিয়ে দেয়"।
বাংলাদেশের
নথি আরও একটি প্রমাণ
যোগ করে—ঢাকায় ১৮৭৭
সালেই কেরোসিনের রাস্তার বাতি বসানো হয়েছিল।
মই কাঁধে বাতিওয়ালাদের গলিতে
গলিতে চলার দৃশ্য তখন
ছিল চেনা।
অন্ধকার
দূর করার একমাত্র ভরসা
ছিল কুপি বাতি আর
হারিকেন। বিদ্যুৎ না থাকা যুগে
হারিকেন ছিল পরিবারের সন্ধ্যার
আলোর উৎস—সপরিবারে একসাথে
বসে গল্প করা, হাসা,
সময় কাটানো, সবই হতো এই
আলোয়। হারিকেন কেবল আলোর যন্ত্র
ছিল না; বিবাহ, সামাজিক
ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সমাবেশেরও আলোক উৎস ছিল
এটি। শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যায় হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করত।
পরবর্তীতে হ্যাজাক লাইটের প্রচলন হয়—আরও উজ্জ্বল এই
আলো বড় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত
হতো।
সন্ধ্যার
আগে হারিকেনের গ্লাসের চিমনি পরিষ্কার করা,
কুপি বাতির সলতে ঠিক
করা, তেল ভরা—এগুলো
ছিল দৈনন্দিন কাজ। চিমনি পরিষ্কার
করতে গিয়ে কখনো ভেঙে
ফেলা, কখনো হাতে কাটা
পড়া, ভাঙা চিমনি তার
দিয়ে বেঁধে কাজ চালানো—এসবই ছিল সাধারণ
অভিজ্ঞতা। কুপি বাতির আলোয়
পড়াশোনা করতে অনেক ঝামেলা
পোহাতে হতো; লম্বা সলতের
কালি নাকে ঢুকে স্বাস্থ্যের
জন্য ক্ষতিকর ছিল। অনেকের স্মৃতিতে
আছে—"দীর্ঘক্ষণ কুপি বাতির আলোয়
পড়াশোনা করলে নাকে আঙুল
দিলে কালো ময়লা লাগত"।
ঢাকার
রাস্তায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলো স্থাপনের সূচনা
হয় ১৮৬৯ সালে, যখন
তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ গ্রাহাম শহর
আধুনিকায়নের প্রস্তাব দেন—যার মধ্যে
কেরোসিন বাতি স্থাপনের বিষয়টিও
অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রকৃত বাস্তবায়ন
ঘটে ১৮৭৭ সালে, যে
বছর রানী ভিক্টোরিয়াকে "ভারত সম্রাজ্ঞী"
ঘোষণা করা হয়। সেই
স্মৃতি স্মরণে ওয়াইজঘাট থেকে
চকবাজার পর্যন্ত প্রথম ৬০টি কেরোসিন
রাস্তার বাতি স্থাপন করা
হয়। সে সময় রাস্তায়
"বাতিওয়ালা" নামে একদল মানুষ
দেখা যেত—তাঁরা মই
ও তেলের পাত্র নিয়ে
সন্ধ্যায় বাতি জ্বালাতেন, ভোরে
গিয়ে নিভিয়ে দিতেন।
নবাব
খাজা আহসানউল্লাহ মূলত রাস্তার জন্য
গ্যাস বাতি স্থাপনের পরিকল্পনা
করেছিলেন, কিন্তু প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রে
এক দশকেরও বেশি সময়
বিলম্বিত হয়। এরপর তিনি
সিদ্ধান্ত নেন সরাসরি বিদ্যুৎ
বাতি স্থাপনের। তিনি গঠন করেন
"ঢাকা ইলেকট্রিক লাইট ট্রাস্ট" এবং
ব্যক্তিগতভাবে প্রায় চার লক্ষ
পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থায়ন
করেন।
১৯০১
সালের ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়
আহসান মঞ্জিলে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কলকাতা থেকে আসা
বাংলার রাজস্ব বোর্ডের সচিব
সি. ডব্লিউ. বোল্টন সুইচ চাপলে
ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে বৈদ্যুতিক
বাতি জ্বলে ওঠে।
মূলত উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও
বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জন
উডবার্ন অসুস্থতার কারণে অনুষ্ঠানে আসতে
পারেননি।
পরদিন
স্থানীয় পত্রিকা "ঢাকা প্রকাশ" প্রতিবেদন
প্রকাশ করে, যেখানে বলা
হয়—এই ধরনের দৃশ্য
দশ বছর আগে "স্বপ্নেও
ভাবা যায়নি", এবং এটি "নবাব
বাহাদুরের অসীম কৃপায়" সম্ভব
হয়েছে। এরপর কেরোসিন রাস্তার
বাতি ও বিদ্যুৎ বাতি
দীর্ঘকাল শহরকে আলোকিত করেছে।
১৯৩৫ সালেও ঢাকায় ৮৬৯টি
কেরোসিন বাতি ও ১০৬৬টি
বিদ্যুৎ বাতি একসঙ্গে ব্যবহৃত
হতো—যা সেই রূপান্তর
কালের সাক্ষী হয়ে আছে।
আজ কেরোসিনওয়ালা, বাতিওয়ালা—সবাই ইতিহাস। কিন্তু তাঁদের সেই সন্ধ্যার আলো, কাচের বোতল, হারিকেনের মৃদু আভা আর "কেরোসিন মামা"র ডাক—এসবই ঢাকার স্মৃতিতে জমা হয়ে আছে এক আলোকিত অধ্যায় হিসেবে।
সম্পাদক : ডা. সেলিম রেজা
কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ