প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
জাদুঘরে চুরির ঢেউ: বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
মোহাম্মদ সেলিম রেজা ||
ইউরোপের জাদুঘরগুলোতে সম্প্রতি চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে
বেড়ে চলেছে। লুভর থেকে
স্পেন, ফ্রান্সজুড়ে ডাকাতির এই ঢেউ বিশ্বজুড়ে
জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে
ফেলেছে—নিদর্শনকে নিরাপদ রাখতে হবে,
আবার দর্শনার্থীর জন্যও খোলা রাখতে
হবে জাদুঘরের দুয়ার। এই বৈশ্বিক সংকটের
প্রতিধ্বনি বাংলাদেশেও শোনা যাচ্ছে। আমাদের
জাতীয় জাদুঘর ও অন্যান্য
সংগ্রহশালাগুলোও একই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ
মোকাবিলা করছে।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ৪৫টি
গ্যালারিতে হাজার বছরের পুরোনো
নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। সম্প্রতি এক
গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের
জাদুঘরগুলোতে মোবাইল ফোনের অননুমোদিত
ব্যবহার অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা
ঝুঁকি। দর্শনার্থীরা অতি সংবেদনশীল নিদর্শনের ছবি বা ভিডিও
তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, কখনো কখনো সেগুলো
ব্যবহার করে নকল তৈরি
করা হচ্ছে। এছাড়া দর্শনার্থীদের
অসাবধানতায় নিদর্শনের ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে।
জাতীয় জাদুঘরের নিরাপত্তা শাখা গ্যালারি ও
স্টোরের সব নিদর্শন রক্ষার
দায়িত্বে নিয়োজিত। তবে কর্তৃপক্ষ স্বীকার
করেছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী ও
সুসংহত করার কাজ চলমান।ছবি: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে প্রদর্শিত হচ্ছে প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন
প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে জাতীয়
জাদুঘরের ৪৫টি
গ্যালারিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে
অ্যান্টি-থেফট
ডোরওয়ে ও
অ্যান্টি-থেফট
নেটওয়ার্ক ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ভাইরাল গ্যালারি আধুনিকায়ন ও
অডিও গাইড চালুর
উদ্যোগও রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে এক্স-রে ব্যাগেজ স্ক্যানার স্থাপন
করা হয়েছে, যা
দর্শনার্থীদের প্রবেশপথে তল্লাশি চালিয়ে বিপজ্জনক বস্তু
শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
ভবিষ্যতের প্রযুক্তি হিসেবে বাংলাদেশের গবেষকরা জাদুঘরে অননুমোদিত মোবাইল ডিভাইস শনাক্ত
করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রযুক্তি (YOLO অ্যালগরিদম) নিয়ে কাজ করছেন।
এই প্রযুক্তি রিয়েল-টাইমে
অননুমোদিত ডিভাইস
চিহ্নিত করে
নিরাপত্তা কর্মীদের সতর্ক করতে সক্ষম।
বিশ্বের বড়
জাদুঘরগুলো নিরাপত্তা ও অভিজ্ঞতার ভারসাম্য রক্ষায় নানা
কৌশল অবলম্বন করছে।
লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রেমব্রান্টের 'দ্য নাইট ওয়াচ'
সংরক্ষণের কাজ
দর্শনার্থীদের সামনেই
করা হচ্ছে—কাচের
আড়ালে থাকলেও মানুষ
দেখতে পাচ্ছেন শিল্পকর্মটি কীভাবে রক্ষা করা
হচ্ছে। এতে নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা একসঙ্গে সম্ভব হচ্ছে।
ইউরোপের জাদুঘরগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে চুরির ঘটনা বেড়েছে। গত জুলাইয়ে লুভর জাদুঘরের গ্যালারি দ্যাপোলোঁ পুনরায় খুললেও নয় মাস আগের বড় চুরিতে রাজপরিবারের কিছু ঐতিহাসিক রত্ন হারিয়ে যায়; বাকি রত্নগুলো নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুধু লুভর নয়—ভিয়েনা, রেনোয়া ও বুরগান্ডির জাদুঘরেও চুরি হয়েছে। গত ২৭ আগস্ট স্পেনের
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের
ভিয়েনায় একটি জাদুঘর থেকে মাত্র চার মিনিটে ব্রোঞ্জ যুগের প্রায় ১০ কেজি স্বর্ণের নিদর্শন চুরি হয়। জুলাইয়ে ফ্রান্সের বুরগান্ডির একটি জাদুঘর থেকে চুরি হয় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো ‘ভিক্স টর্ক’। সাধারণ দর্শনার্থী সেজেই জাদুঘরে ঢুকেছিল চোরের দল। ইউরোপোলের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ সাল থেকে জাদুঘরে ডাকাতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; কোথাও কাচ ভাঙা, হাতুড়ি, কুঠার, শাবল কোথাও বিস্ফোরক বা অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে।
ইউরোপোলের ইউরোপীয় ইউনিয়ন অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের প্রধান জ্যঁ-ইভ গোরিওর মতে, ২০২২-২৩ সালের দিকে শুরু করে জাদুঘরে ডাকাতির ঘটনা স্পষ্টভাবেই বেড়েছে।
জাদুঘরের উন্মুক্ত পরিবেশই মূল
আকর্ষণ, তবে তা
নিরাপত্তা ঝুঁকি
তৈরি করছে। বাজেট
সীমাবদ্ধতা ও
দর্শনার্থীদের জন্য
খোলা রাখার শর্তে
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে, ফলে
দর্শনার্থীর অভিজ্ঞতা বদলে যাচ্ছে। বড়
জাদুঘর কিছু হারালেও অনেক নিদর্শন থাকে,
কিন্তু ছোট জাদুঘরের জন্য এটি বড়
ধাক্কা।
মূল নিদর্শন ঝুঁকিপূর্ণ হলে প্রতিলিপি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। ফ্রান্সের নতুন
নিরাপত্তা পরিকল্পনায় ঝুঁকিপূর্ণ আসল
নিদর্শন সাময়িকভাবে লুকিয়ে রাখার
কথা বলা হয়েছে। বুরগান্ডি, প্যারিসের কন্যাক-জেও ও
কার্নাভালেও মূল্যবান সামগ্রীর বদলে
কম মূল্যের বা
প্রতিলিপি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে আসল নিদর্শন দেখার অনুভূতি আলাদা—তবে
কেন আসল রাখা
হয়নি তা স্পষ্টভাবে জানালে দর্শনার্থীরা প্রতিলিপি মেনে নিতে পারেন।
আন্তর্জাতিক জাদুঘর
পরিষদ (ICOM) বলছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
জাদুঘরের নৈতিক
বাধ্যবাধকতা। আইকম-এর
নীতিমালায় 'নিরাপত্তা' শব্দটি এগারোবার উল্লেখ
করা হয়েছে—যা
প্রমাণ করে বিষয়টির গুরুত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের নর্টন সাইমন
মিউজিয়ামে চিত্রকর্মে ক্ষুদ্রাকৃতি আরএফআইডি ট্যাগ এমবেড করা
হয়েছে, যা নড়াচড়া করলেই অ্যালার্ম বাজায়।
বড় জাদুঘরে একটি
নিদর্শন হারালেও অনেক কিছু দেখার
সুযোগ থাকে। কিন্তু
ছোট জাদুঘরের জন্য
তা বড় ধাক্কা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত আরো
জটিল—কারণ আমাদের
সংগ্রহ অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হারানো
মানে ইতিহাসের একটি
অংশ হারানো।
তবে নিরাপত্তার স্বার্থে আসল সরিয়ে প্রতিলিপি রাখার ঘটনা নতুন
নয়। ফ্রান্সের ভিক্স
টর্কের দুটি নিখুঁত
স্বর্ণের প্রতিলিপি আগে থেকেই তৈরি
ছিল—আসলটি না
পাঠিয়ে প্রদর্শনীতে পাঠানো হয়েছিল প্রতিলিপি। বাংলাদেশেও যদি
কোনো নিদর্শন উচ্চ
ঝুঁকিতে থাকে,
তবে স্বচ্ছভাবে জানিয়ে প্রতিলিপি প্রদর্শনের কথা ভাবা যেতে
পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
কেন আসলটি সরানো
হয়েছে তা দর্শনার্থীদের পরিষ্কারভাবে জানালে
তারা প্রতিলিপি মেনে
নিতে পারেন। এমএইচএমের পরিচালক গাই
টারটনের ভাষায়,
আসল নিদর্শন দেখার
মধ্যে আলাদা অনুভূতি কাজ করে—মনে
হয়, বহু বছর
আগে অন্য কেউও
একই জিনিসটি তৈরি
করেছেন। এই
অনুভূতিই জাদুঘর
দেখার বিশেষ আকর্ষণ।
২০১০ সালের মার্চ
মাসে জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদী বিভাগের ২১
নম্বর গ্যালারি থেকে
২৬টি নিদর্শন (২টি
স্বর্ণ ও ২৪টি
ব্রোঞ্জের মুদ্রা)
খোয়া যায়।
পরের বছর ২০টি
নিদর্শন পাওয়া
গেলেও বাকি ছয়টি
এখনো নিখোঁজ রয়েছে। ১৯৮১ সাল
থেকে এখন পর্যন্ত এমন চুরির ঘটনা
ঘটেছে ২০টি।
পুরান ঢাকার নিমতলীতে জাতীয় জাদুঘরের ভবন
থাকার সময় ১৯৮১
ও ১৯৮২ সালের
মধ্যে জাতীয় জাদুঘর
থেকে ১৪৪টি প্রাচীন নিদর্শন, মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য মূর্তি
চুরি হয়। খোয়া
যায় বেশ কিছু
ঐতিহাসিক খাবারপাত্রও। এগুলো আর উদ্ধার
করা যায়নি।
১৯৯১ সালে জাদুঘরের তিনতলায় লোহার
গ্রিল কেটে শোকেস
ভেঙে চুরি করা
হয় দীঘাপাতিয়ার মহারাজার ব্যবহৃত সিংহমূর্তি আকৃতির সিংহাসনের হাতলটি। ২০০৭ সালে
ফ্রান্সের গিমে
জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশের পাঁচটি
জাদুঘর থেকে ১৪৫টি
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ করা হয়।
এ জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও
ফরাসি দূতাবাসের মধ্যে
একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী একই বছরের ২৫
ডিসেম্বর পুরাকীর্তির প্রথম চালানটি বিমানে
ওঠানোর আগে ষষ্ঠ
ও সপ্তম দশকের
দুটি বিষ্ণুমূর্তি খোয়া
যায়।
২০১০ সালের মার্চ মাসে জাদুঘরের চতুর্থ তলায় প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগের সংরক্ষণ কক্ষ থেকে বেশ কিছু পুরাকীর্তি চুরি হয়। এসবের মধ্যে ছিল ১০টি হাতির দাঁত, তিনটি ফিঙ্গে পাখির মমি ও একটি হলদে পাখির মমি। চোরকে ধরা যায়নি, পুরাকীর্তিগুলোও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ৫
আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের কয়েকটি জাদুঘরে ভাঙচুর
ও লুটপাটের ঘটনা
ঘটে। এর মধ্যে
স্বাধীনতা জাদুঘর
ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়
এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য
বন্ধ রয়েছে; ভেতরে
কাচ ভাঙা, পোড়া
দেয়াল ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে।
বরগুনা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরেও একই দিনে হামলা
হয়, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ আলোকচিত্র, বই ও নিদর্শন লুট হয় এবং
দেড় বছর পরও
তা ফেরত আসেনি।
সোনারগাঁ জাদুঘরেও অনেক প্রাচীন নিদর্শন ও কারুশিল্প চুরি
হয়েছে।
ছবি: জাদুঘর থেকে হারিয়ে যাওয়া মহামূল্যবান প্রত্ননিদর্শন সঠিক সংরক্ষণ অতীব জরুরিউদ্ধার করতে হবে
এছাড়াও মহাস্থান জাদুঘরের ফ্রান্সে পাঠানো
৪৭টি প্রত্ননিদর্শন ফেরত
আসার পর আসল
না প্রতিলিপি—তা
নিয়ে তদন্ত চলছে। এসব ঘটনায়
জাদুঘর নিরাপত্তা ও
সংরক্ষণ ব্যবস্থা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে
দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের জাদুঘরগুলোর সামনে এখন কঠিন প্রশ্ন—নিদর্শন নিরাপদ রাখা যাবে কীভাবে, আবার সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়া যাবে কীভাবে?
সম্পাদক : ডা. সেলিম রেজা
কপিরাইট © ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত পরিবেশ কণ্ঠ